ফরিদপুর শহরের রবিদাস পল্লির বাসিন্দা ৫০ বছর বয়সী সুকুমার রবিদাস দীর্ঘ চার দশক ধরে জুতা তৈরি ও মেরামতের কাজ করছেন। তাঁর বাবা এবং দাদার কাছ থেকে পাওয়া এই বংশগত পেশাকে আঁকড়ে ধরে বেঁচে থাকার চেষ্টা করছেন তিনি। শহরের কুমার নদের পাড়ে ময়রাপট্টিতে রাস্তার ধারে একটি স্যানিটারি দোকানের সামনেই তাঁর কর্মস্থল। প্রতিদিন সকাল ১০টা থেকে রাত পর্যন্ত সেখানে অবস্থান করেন তিনি, কেবল দুপুরে একবার বাড়িতে গিয়ে খাবার খেয়ে আসেন।
সুকুমারের জীবন এখন অনিশ্চয়তায় ঘেরা। তাঁর মতে, বর্তমান সময়ে সংসার চালাতে প্রতিদিন অন্তত ৮০০ টাকার প্রয়োজন হয়, কিন্তু তাঁর আয় সব সময় তা নিশ্চিত করে না। কোনো দিন হয়তো ৫০০ টাকা আয় হয়, আবার কোনো দিন ৩০০ টাকা বা তারও কম। চার সদস্যের এই পরিবারের একমাত্র উপার্জনকারী সুকুমার। তাঁর স্ত্রী শোভারানী গৃহিণী, মেয়ে টুম্পা এসএসসি উত্তীর্ণ এবং ছেলে মনোজ অষ্টম শ্রেণিতে পড়াশোনা করছে। এই টানাপোড়েন শুধু তাঁর একার নয়, বরং তাঁর পেশার সাথে জড়িত প্রায় সবারই একই করুণ দশা।
সুকুমার আক্ষেপ করে জানান, একসময় হাতে তৈরি জুতা-স্যান্ডেলের ব্যাপক চাহিদা ছিল। মানুষ আগে থেকে বায়না দিয়ে ডজন கணতে জুতা বানিয়ে নিত। কিন্তু বর্তমানে বাজার মেশিনে তৈরি জুতা দিয়ে ছেয়ে গেছে, ফলে হস্তশিল্পের কদর কমেছে। এখন মাসে মাত্র ১৮-২০ জোড়া জুতার অর্ডার পান তিনি, যার মধ্যে কিছু জুতা ক্রেতা নিতে আসেন না। প্রতি জোড়া জুতা থেকে ১০০ টাকা লাভ হলেও মাসে এই খাত থেকে আয় হয় মাত্র দুই হাজার টাকার মতো। মূল উপার্জনের উৎস হয়ে দাঁড়িয়েছে পুরোনো জুতা মেরামত ও রং-পলিশের কাজ, যা থেকে মাসে ১৫ হাজার টাকা আয় করেন। সব মিলিয়ে মাসিক আয় ১৭ হাজার টাকার কাছাকাছি হলেও জীবনযাত্রার ব্যয় মেটাতে তাঁকে ঋণের ওপর নির্ভর করতে হয়। মুদি দোকানে বাকি রাখা এবং সমিতির কাছ থেকে ঋণ নিয়ে কিস্তিতে পরিশোধ করার এক চক্রে আটকা পড়েছেন তিনি।
সামাজিক ও পেশাগত অবস্থাও আশঙ্কাজনক। পাকিস্তান আমলে ময়রাপট্টিতে এই পেশার ২০-২৫ জন কারিগর বসতেন, যা বর্তমানে কমে দাঁড়িয়েছে মাত্র চারজনে। নতুন প্রজন্মের মধ্যে এই কাজ শেখার কোনো আগ্রহ নেই; তারা সেলুন বা মার্কেটে কাজ করতে বেশি আগ্রহী। সুকুমার নিজেও চান না তাঁর ছেলে এই কষ্টের পেশায় আসুক। তবে তাঁর বিশ্বাস, যতক্ষণ এই সম্প্রদায় থাকবে, ততক্ষণ এই পেশা একেবারে বিলীন হবে না, কারণ যারা পড়াশোনা করতে পারে না তারা শেষ পর্যন্ত এই পথেই আসবে।
জীবনযুদ্ধের পাশাপাশি আবাসন সমস্যাও তাঁদের নিত্যসঙ্গী। রবিদাস পল্লির ৪৭টি পরিবারের বসতি টিকিয়ে রাখতে তাঁদের দীর্ঘ লড়াই করতে হয়েছে। সুকুমারের ভাষ্যমতে, ২০১২ সালে উচ্ছেদ অভিযানে তাঁরসহ ১৩টি ঘর ভেঙে দেওয়া হয়। তবে আদালতের লড়াই ও দৃঢ় প্রতিবাদের মাধ্যমে তাঁরা পুনরায় বসবাসের সুযোগ পান। বর্তমানে তিনি টিনের চাল ও বেড়ার একটি জরাজীর্ণ ছোট ঘরে জীবন অতিবাহিত করছেন, যেখানে শৌচাগারের জন্য তাঁদের বারোয়ারি ব্যবস্থার ওপর নির্ভর করতে হয়। এই দীর্ঘদিনের দারিদ্র্য ও বঞ্চনা থেকে মুক্তি পেতে তিনি সরকারি সহযোগিতার প্রত্যাশা করেন।
এত অভাবের মাঝেও সুকুমারের মনে কাজের প্রতি এক গভীর ভালোবাসা রয়েছে। নতুন জুতা তৈরি করা তাঁর কাছে আনন্দের। অনেক সময় কোনো অর্ডার না থাকলেও নিজের তৃপ্তির জন্য তিনি রাত জেগে জুতা বানান, যা বিক্রির চিন্তা তাঁর মাথায় থাকে না।




