মাগুরা জেলার মহম্মদপুর উপজেলার ডুমুরশিয়া গ্রামে এক শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে চলে আসা ঐতিহ্যবাহী লাঠিখেলা ও মেলার ১০৬তম আয়োজন শুরু হয়েছে। গত শুক্রবার ডুমুরশিয়া ডিসি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের মাঠে দুই দিনব্যাপী এই উৎসবের উদ্বোধন করেন সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে মন্ত্রী নিজেও লাঠিয়ালদের সঙ্গে লাঠিখেলায় অংশ নেন এবং এই প্রাচীন খেলাটিকে আবহমান বাংলার লোকজ সংস্কৃতির এক অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে অভিহিত করেন। তিনি জানান, গ্রামীণ জনপদের জীবন ও ঐতিহ্যের সাথে এই খেলাগুলোর গভীর সম্পর্ক রয়েছে এবং বর্তমান সরকার এই ধরনের লোকজ সংস্কৃতি সংরক্ষণ ও বিকাশে সচেষ্ট।
এই ঐতিহ্যবাহী আয়োজনের মূলে রয়েছে একটি পরিবারের দীর্ঘদিনের প্রচেষ্টা। জানা গেছে, মাগুরা সদর উপজেলার বাগবাড়িয়ার বাসিন্দা ইমাম উদ্দিন সরদার, যিনি লাঠিখেলায় অত্যন্ত দক্ষ ছিলেন, তাঁর উদ্যোগেই এই চর্চা শুরু হয়। তিনি ডুমুরশিয়ার পশ্চিম পাড়ায় বসতি স্থাপন করে তালুকদার মতিউর রহমানের সহযোগিতায় বাড়ির সামনে ও কাছারিতে লাঠিখেলা এবং শারীরিক কসরতের আয়োজন করতেন। পরবর্তীতে তাঁর মৃত্যুর পর পুত্র চিকিৎসক মোকররম হোসেন তাঁর পিতার স্মৃতি রক্ষায় প্রতিবছর এই আয়োজন শুরু করেন। এরপর তাঁর পুত্র চিকিৎসক আবদুর রাজ্জাক এবং স্থানীয় মাতব্বরদের সহযোগিতায় এটি একটি বার্ষিক উৎসবে পরিণত হয়। বর্তমানে ডুমুরশিয়া বাজার বণিক সমিতি এই আয়োজনের দায়িত্ব পালন করছে।
স্থানীয়দের মতে, ১৯১৩ সালের পর থেকে এই আয়োজন নিয়মিতভাবে হয়ে আসছে, যদিও এর সূচনার সঠিক তারিখ জানা যায়নি। তবে ১৯৯৮ সাল থেকে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের সংযোজন এবং মেলার মেয়াদ বাড়িয়ে দুই দিন করা হয়। বর্তমানে লাঠিখেলা ছাড়াও বিচারগান এবং পালাগান মেলার অন্যতম প্রধান আকর্ষণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। মেলার মাঠজুড়ে খাবারের দোকান, খেলনা এবং জেলেদের মাছ বিক্রির দোকান বসেছে, যা দর্শনার্থীদের জন্য বাড়তি আনন্দ বয়ে আনছে।
স্থানীয় বাসিন্দা মো. আরিফুজ্জামান জানান, এই মেলার জন্য ডুমুরশিয়াসহ আশেপাশের ১০টি গ্রামের মানুষ ঈদ বা পূজার মতো প্রস্তুতি নেয়। আত্মীয়-স্বজনের দাওয়াত এবং ঘরে ঘরে মুড়ি-চিড়া ভাজার মাধ্যমে উৎসবের আমেজ তৈরি হয়। অনেকের কাছেই এটি কেবল খেলা দেখার সুযোগ নয়, বরং আত্মীয়দের সাথে পুনর্মিলনের একটি উপলক্ষ।
অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন ডুমুরশিয়া বাজার বণিক সমিতির সভাপতি মো. আবুল হোসেন। তিনি তাঁর বক্তব্যে উল্লেখ করেন যে, জমিদারি আমলে আত্মরক্ষা ও শারীরিক সক্ষমতা প্রদর্শনের জন্য লাঠিয়াল বাহিনীর যে চর্চা ছিল, তা থেকেই এই খেলার বিস্তার ঘটে। সময়ের সাথে সামরিক গুরুত্ব হারিয়ে গেলেও বিনোদন এবং লোকসংস্কৃতির অংশ হিসেবে এটি ডুমুরশিয়ার ঐতিহ্যে পরিণত হয়েছে। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন মাগুরা জেলা প্রশাসক মোতাকাব্বীর আহমেদ এবং মহম্মদপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) বেদবতী মিস্ত্রী।




