চট্টগ্রামের উত্তর পতেঙ্গার এক জেলেপল্লিতে ১৯৫৫ সালে জন্মগ্রহণ করা হরিশংকর জলদাস আজ বাংলা সাহিত্যের অন্যতম বিশিষ্ট কথাসাহিত্যিক। এক দীর্ঘ জীবনসংগ্রামের গল্প শুনিয়েছেন তিনি, যেখানে দারিদ্র্য এবং সামাজিক বৈষম্যের বিরুদ্ধে লড়াই ছিল প্রধান উপজীব্য। জেলেপল্লির প্রথম স্কুলগামী শিশু হিসেবে তাঁর যাত্রা সহজ ছিল না। তবে বাবার প্রবল ইচ্ছার কারণেই তিনি শিক্ষার আলো পান। তাঁর বাবা যুধিষ্ঠির জলদাস নিজে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনা করলেও সন্তানদের জন্য শিক্ষার পথ প্রশস্ত করতে চেয়েছিলেন, কারণ তাঁর দাদা সাগরে নৌকাডুবির শিকার হয়েছিলেন। সমুদ্রের প্রতি বাবার সেই জন্মগত ক্রোধই হরিশংকর ও তাঁর ভাইবোনদের পড়াশোনার অনুপ্রেরণা হয়ে দাঁড়িয়েছিল।

বড় পরিবারের বড় ছেলে হিসেবে পড়াশোনার পাশাপাশি সংসারের হাল ধরতে হয় তাঁকে। ১১-১২ বছর বয়স থেকেই বাবার সঙ্গে সাগরে গিয়ে মাছ ধরতে শুরু করেন তিনি। শৈশবে স্কুল জীবনের এক তিক্ত স্মৃতি স্মরণ করে তিনি বলেন, পঞ্চম শ্রেণির ফলাফল প্রকাশের দিনে তিনি প্রথম হলেও একজন অভিভাবকের কাছ থেকে 'জাইল্লার ফোয়া' বলে অবমাননা শুনতে হয়েছিল। কিন্তু সেই অপমান তাঁকে দমাতে পারেনি, বরং আরও পড়াশোনা করার জেদ বাড়িয়ে দিয়েছিল। জীবনের দীর্ঘ সময় তিনি ক্ষুধার সাথে লড়াই করেছেন। এমনকি কলেজে শিক্ষকতা করার সময়ও পরিবারের অভাব মেটাতে রাতে মাছ ধরতে যেতেন এবং সকালে স্নান করে ক্লাসে যেতেন।

সাহিত্যের আঙিনায় তাঁর প্রবেশের পেছনে ছিল জাতপাত ও নিম্নবর্গের মানুষের প্রতি সমাজের তাচ্ছিল্য। বিশেষ করে 'ডোম' বা 'জাইল্লা' শব্দের মাধ্যমে যে অবজ্ঞা প্রকাশ করা হতো, তা তাঁকে গভীরভাবে আলোড়িত করেছিল। এই সামাজিক বৈষম্যের কারণ খুঁজতে তিনি 'বাংলা উপন্যাসে কৈবর্তজীবন' বিষয়ে পিএইচডি করেন। গবেষণার পর তিনি অনুভব করেন, প্রচলিত অনেক উপন্যাসে জেলেজীবনের যে চিত্র ফুটে উঠেছে তা বাস্তবের সঙ্গে মেলে না। এই সত্যকে তুলে ধরতেই তিনি নিজের অভিজ্ঞতা থেকে লিখতে শুরু করেন। তাঁর 'জলপুত্র', 'দহনকাল' ও 'নোনাজলে ডুবসাঁতার' উপন্যাসে জেলেসমাজের বঞ্চনা ও সংগ্রামের কথা স্পষ্টভাবে উঠে এসেছে।

বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার এবং একুশে পদকসহ অসংখ্য সম্মানে ভূষিত হয়েও তিনি নিজেকে একজন সাধারণ মানুষ হিসেবেই দেখেন। তাঁর আত্মকথা 'নোনাজলে ডুবসাঁতার'-এ তিনি জীবনের সব অন্ধকার দিক, এমনকি শিক্ষকের দ্বারা যৌন নিপীড়নের tentativasের কথা অকপটে বর্ণনা করেছেন। বর্তমান প্রজন্মের প্রতি তাঁর আক্ষেপ এই যে, অনেক মেধাবী শিক্ষার্থী থাকা সত্ত্বেও তাদের আত্মবিশ্বাসের অভাব এবং পাশে দাঁড়ানোর মতো মানুষের অভাব রয়েছে। তিনি বিশ্বাস করেন, প্রতিটি মানুষই একটি মাটির প্রদীপের মতো, যার ভেতরে সলতে আছে। শুধু সঠিক অনুপ্রেরণা বা 'আগুন' জ্বালিয়ে দেওয়ার প্রয়োজন, যা তাঁর বাবা তাঁদের পরিবারের জন্য করেছিলেন। তাঁর এই বিশ্বাসই আজ তাঁকে একজন সফল লেখক ও গবেষক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।