খাবারের স্বাদ বাড়াতে আমরা যে লবণের ব্যবহার করি, তা প্রয়োজনের অতিরিক্ত হলে মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করতে পারে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO)-এর নির্দেশনা অনুযায়ী, একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের দৈনিক লবণের পরিমাণ ৫ গ্রামের কম বা এক চা-চামচের চেয়ে কম হওয়া উচিত। তবে বাংলাদেশের বাস্তব চিত্র ভিন্ন; এখানে গড় লবণ গ্রহণ ৫ গ্রামের চেয়ে অনেক বেশি। ২০১৭-১৮ সালের একটি গবেষণায় প্রস্রাব পরীক্ষার মাধ্যমে দেখা গেছে, দেশে গড়ে প্রতিদিন ৯.৭ গ্রাম লবণ গ্রহণ করা হয়, যা আন্তর্জাতিক মানের প্রায় দ্বিগুণ। বাংলাদেশ খাদ্য নিরাপত্তা কর্তৃপক্ষ ও ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশনের এক সেমিনারে জানানো হয়েছে, উচ্চ সোডিয়ামযুক্ত খাবারের কারণে দেশে বছরে প্রায় ২৪ হাজার মানুষের মৃত্যু ঘটে। বর্তমানে অসংক্রামক রোগ যেমন—কিডনি সমস্যা, হৃদরোগ ও উচ্চ রক্তচাপ মৃত্যুর অন্যতম প্রধান কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে, যার পেছনে লবণের ভূমিকা অনস্বীকার্য।

স্বাস্থ্যঝুঁকি কেবল রান্নার লবণে নয়, বরং প্যাকেটজাত ও প্রক্রিয়াজাত খাবারের মধ্যে 'লুকানো লবণ' হিসেবে থাকে। বিস্কুট, চিপস, চানাচুর, সসেজ, নুডলসের মসলা এবং বিভিন্ন সসে প্রচুর পরিমাণে সোডিয়াম থাকে। এমনকি ফাস্টফুড যেমন বার্গার বা পিৎজাতেও বাড়তি লবণ থাকে। উদ্বেগের বিষয় হলো, অনেক সময় মোড়কের গায়ের লেবেলে উল্লিখিত পরিমাণের চেয়ে প্রকৃত লবণের পরিমাণ বেশি থাকে। এক গবেষণায় ১০৫টি নমুনার মধ্যে ৩৫.২ শতাংশে লবণের পরিমাণ অত্যন্ত বেশি পাওয়া গেছে এবং ৪২ শতাংশ পণ্যে লেবেলের তথ্যের সাথে অমিল দেখা গেছে। তাই প্যাকেটজাত খাবারের বদলে তাজা মাছ-মাংস, ফলমূল এবং ঘরে তৈরি খাবারের বিকল্প বেছে নেওয়া শ্রেয়। বিকেলের নাস্তায় নিমকি বা বিস্কুটের বদলে মুড়ি, বাদাম বা ঘরে তৈরি পিঠা খাওয়া স্বাস্থ্যকর হতে পারে।

অনেকের ধারণা লবণ ছাড়া খাবার অরুচিকর। তবে হঠাৎ করে লবণ বন্ধ না করে ধীরে ধীরে এর পরিমাণ কমানোর পরামর্শ দেওয়া হয়, যাতে স্বাদকোরক নতুন অভ্যাসের সাথে মানিয়ে নিতে পারে। স্বাদের বিকল্প হিসেবে লেবুর রস, ধনেপাতা, পুদিনাপাতা, রসুন ও পেঁয়াজ ব্যবহার করা যেতে পারে। একইসঙ্গে টেস্টিং সল্ট, বেকিং সোডা, মেয়োনিজ বা বিভিন্ন ধরনের সস ব্যবহারের ক্ষেত্রে সতর্ক থাকা জরুরি।

লবণ নিয়ে সমাজে কিছু ভুল ধারণা প্রচলিত আছে। যেমন—অনেকে মনে করেন রান্না করা লবণে ক্ষতি নেই, শুধু কাঁচা লবণ ক্ষতিকর। আসলে লবণ যেভাবেই খাওয়া হোক না কেন, সোডিয়ামের পরিমাণ একই থাকে। আবার রক সল্ট বা পিংক সল্টকে স্বাস্থ্যকর মনে করা হলেও এগুলোতেও সোডিয়াম থাকে এবং দীর্ঘমেয়াদে এগুলো ব্যবহার করলে আয়োডিনের ঘাটতি হতে পারে। মনে রাখতে হবে, লবণ কমানোর অর্থ আয়োডিনযুক্ত লবণ খাওয়া বন্ধ করা নয়, বরং পরিমিত পরিমাণে খাওয়া।

বিশেষ করে যাদের উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস, হৃদরোগ বা কিডনির সমস্যা রয়েছে, তাদের জন্য লবণ নিয়ন্ত্রণ জীবনরক্ষাকারী হতে পারে। এছাড়া গর্ভবতী নারী এবং স্থূল ব্যক্তিদেরও এই বিষয়ে সচেতন হওয়া প্রয়োজন। কেবল অসুস্থদের জন্য নয়, তরুণ প্রজন্মের মধ্যেও সচেতনতা প্রয়োজন; কারণ রোগ হওয়ার পর চিকিৎসার চেয়ে শুরু থেকেই পরিমিত খাদ্যাভ্যাস গড়ে তোলা অনেক বেশি সহজ ও কার্যকর। রান্নায় লবণের পরিমাণ নিয়ন্ত্রণ এবং খাবারের উপর বাড়তি লবণ ছিটিয়ে খাওয়ার অভ্যাস ত্যাগের মাধ্যমেই সুস্থ জীবনের সূচনা হতে পারে।