দুই দশক আগে আবাসন খাতের উত্থান-পতন যেমন যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতির গতিপথ বদলে দিয়েছিল, তেমনই এখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) বুম দেশটির প্রবৃদ্ধির চালিকাশক্তিকে নতুনভাবে সাজাচ্ছে। ইন্টারনেট পরিষেবা ও ডেটা সেন্টার নির্মাণে প্রযুক্তি জায়ান্টরা এত বিপুল অর্থ ঢালছে যে কয়েকটি কোম্পানির বিনিয়োগ শীঘ্রই বার্ষিক ১ ট্রিলিয়ন ডলারের ঘরে পৌঁছবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। অন্যদিকে, ২০২২ সালে ফেডারেল রিজার্ভ মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে আগ্রাসী সুদহার বৃদ্ধি শুরু করার পর থেকে আবাসন বাজার কার্যত হিমায়িত হয়ে আছে। সান ফ্রান্সিসকো ফেডের ভাইস প্রেসিডেন্ট অ্যাডাম শাপিরো সম্প্রতি লিংকডইনে মন্তব্য করেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন ঘটছে—বিনিয়োগ আবাসন থেকে কম্পিউটার ও তথ্য প্রক্রিয়াকরণ যন্ত্রপাতির দিকে সরে যাচ্ছে। তিনি উল্লেখ করেছেন, মুদ্রাস্ফীতি সমন্বয়ের পর তথ্য প্রক্রিয়াকরণ সরঞ্জামে (ডেটা সেন্টার ও কম্পিউটার হার্ডওয়্যারসহ) ব্যয় এখন আবাসন খাতের চেয়ে বেশি। বাণিজ্য বিভাগের (বিউরো অব ইকোনমিক অ্যানালাইসিস) তথ্য অনুযায়ী, দ্বিতীয় প্রান্তিকে প্রকৃত ব্যক্তিখাতের আবাসন স্থায়ী বিনিয়োগ ছিল ৭৪৮ বিলিয়ন ডলার, যা ২০২১ সালের শুরুর শিখর থেকে ১৮ শতাংশ কম। একই সময়ে তথ্য প্রক্রিয়াকরণ সরঞ্জামে ব্যয় ৫১ শতাংশ বেড়ে ৭৫২ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। শাপিরো আরও বলেন, এআই বিনিয়োগ বুম বিশাল আকার ধারণ করেছে, আর আবাসন খাত ঋণের খরচের প্রতি বেশি সংবেদনশীল, যা ট্রেজারি ইল্ডের সঙ্গে বেড়েছে। বেঞ্চমার্ক ৩০ বছর মেয়াদি বন্ধকী সুদের হার এখন প্রায় ৭ শতাংশ, আর ১০ বছর মেয়াদি বন্ডের ইল্ড ২০০৭ সালের পর সর্বোচ্চ। বিপরীতে এআই খাতে বিনিয়োগ সুদহারের প্রতি কম সংবেদনশীল, যদিও হাইপারস্কেলাররা নগদ মজুদ কমিয়ে আরও ঋণ নিতে শুরু করেছে। যেমন গুগলের মালিক আলফাবেট এ বছর নেতিবাচক নগদ প্রবাহের খবর দিয়েছে। ট্রেজারি সেক্রেটারি স্কট বেসেন্টও তুলে ধরেছেন যে এআই কোম্পানিগুলো ঋণের খরচ যতই হোক না কেন সাগ্রহে ঋণ নিচ্ছে। তিনি সম্প্রতি বলেন, বড় কর্পোরেট ঋণ ইস্যু দেখা যাচ্ছে, আর সেই ইস্যুর অনেকটাই প্রায় সুদহার-নির্বিশেষ, কারণ কোম্পানিগুলো বিশ্বাস করে এআই নির্মাণ থেকে রিটার্ন এত বেশি হবে যে তারা কত দাম দিচ্ছে তা নিয়ে ভাবছে না। এআই ব্যয়ের এই ধারা আরও বাড়বে বলে প্রত্যাশা করা হচ্ছে। গত মাসে এসঅ্যান্ডপি গ্লোবাল অনুমান করেছে, অ্যালফাবেট, অ্যামাজন, মাইক্রোসফট, মেটা, ওরাকল এবং স্পেসএক্সের মূলধনী ব্যয় ২০২৫ সালে ৪৭০ বিলিয়ন ডলার থেকে ২০২৬ সালে ৮৭০ বিলিয়ন এবং ২০২৭ সালে ১.৩ ট্রিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যাবে। রেটিং সংস্থাটি আরও জানিয়েছে, শিল্পের মূলধনী ব্যয় রাজস্বের চেয়ে দ্রুত বাড়ছে, এবং সতর্ক করেছে যে যদি ভবিষ্যতে চাহিদা প্রত্যাশা অনুযায়ী না হয় তবে আক্রমণাত্মক নির্মাণকাজ অতিরিক্ত সক্ষমতা তৈরি করতে পারে। এসঅ্যান্ডপি ২০২৮ সালকে একটি বাঁকবিন্দু হিসেবে দেখছে, যখন রাজস্ব ত্বরান্বিত হবে এবং মূলধনী ব্যয় সমতল হবে। তবে তার আগ পর্যন্ত ছয়টি হাইপারস্কেলারের সম্মিলিত পরিচালন নগদ প্রবাহ ২০২৬ ও ২০২৭ সালে নেতিবাচক থাকবে। এআই উন্নয়নের এই গতিও ব্যাপক রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া তৈরি করছে, যা মধ্যবর্তী নির্বাচন মৌসুমে প্রভাব ফেলছে। সম্প্রতি এনবিসি নিউজের একটি জরিপে ৬৪ শতাংশ নিবন্ধিত ভোটার বলেছেন, তাদের সম্প্রদায়ে ডেটা সেন্টার নির্মাণের পক্ষে এমন প্রার্থীকে তারা কম সমর্থন করবেন। এআই জীবনযাত্রার ব্যয় সংকটেও অবদান রাখছে, কারণ ভোক্তারা উচ্চ বিদ্যুৎ বিল এবং স্মার্টফোন ও পিসির দাম বৃদ্ধির মুখোমুখি হচ্ছেন। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে গৃহমূল্যের উচ্চতা, যা অনেকের নাগালের বাইরে। আবাসন সরবরাহ বাড়লে দামের চাপ কমবে, কিন্তু প্রাপ্যতা সীমিত। বিদ্যমান বাড়ির সরবরাহ 'লক-ইন' প্রভাবের কারণে আটকে আছে—কম বন্ধকী সুদে নেওয়া মালিকরা বর্তমান উচ্চ সুদে সেই সুবিধা ছাড়তে রাজি নন। নতুন নির্মাণও দুর্বল, কারণ উচ্চ সুদ চাহিদা কমিয়ে দিচ্ছে আর নির্মাণ ব্যয় বাড়ছে। আগস্টে আবাসন নির্মাণ শুরু ২.৬ শতাংশ কমে বার্ষিক হারে ১২.৭৫ লক্ষে দাঁড়িয়েছে, বিশেষত বহু-পরিবারের প্রকল্পে পতন। একক পরিবারের ঘর বাড়লেও পারমিট কমেছে, যা ভবিষ্যতে কার্যকলাপ ম্লান হওয়ার ইঙ্গিত দেয়। ন্যাশনাল অ্যাসোসিয়েশন অব হোম বিল্ডার্স জানিয়েছে, নির্মাতাদের আস্থা এক বছরের মধ্যে সর্বনিম্নে নেমেছে। ক্যাপিটাল ইকোনমিক্স সম্প্রতি এক নোটে বলেছে, মূল চিত্র হলো উচ্চ ও ক্রমবর্ধমান ঋণের খরচ ডেভেলপারদের আটকে রেখেছে, যা আমাদের ধারণা সমর্থন করে যে আবাসন নির্মাণে নিম্নমুখী প্রবণতা আরও চলতে পারে।
মার্কিন অর্থনীতিতে ঐতিহাসিক মোড়: ডেটা সেন্টার বিনিয়োগ এখন আবাসন খাতকেও ছাড়িয়ে গেছে
যুক্তরাষ্ট্রে এআই অবকাঠামোয় ব্যয় এখন আবাসন খাতের চেয়ে বেশি। হাইপারস্কেলারদের বিনিয়োগ ১ ট্রিলিয়ন ডলারে পৌঁছানোর আশা। আবাসন খাত স্থবির, সুদের হার বাড়ায় সংকট।




