একসময় অতি-ধনী ব্যক্তিদের মধ্যে বিলাসবহুল বাড়ি কেনা বা বিক্রির খবরটি ঢাকঢোল পিটিয়ে প্রচার করার প্রবণতা ছিল। ড্রোন শট, চাকচিক্যময় বিজ্ঞাপন এবং প্রেস রিলিজের মাধ্যমে মালিকের নাম প্রকাশ করে নিজেদের সম্পদের প্রদর্শনী করা হতো। তবে বর্তমান সময়ে এই চিত্র বদলে গেছে। এখনকার ধনকুবেরদের কাছে সবচেয়ে বড় বিলাসিতা হয়ে দাঁড়িয়েছে 'গোপনীয়তা'।

পালো অল্টো ভিত্তিক ডিলেয়ন রিয়েলটির প্রতিষ্ঠাতা কেন ডিলেয়ন জানান, এই নতুন প্রবণতাকে বলা হচ্ছে 'স্টেলথ ওয়েলথ' (Stealth Wealth) বা প্রচ্ছন্ন সম্পদ। বিশেষ করে সিলিকন ভ্যালির টেক এবং এআই (AI) খাতের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা এখন অত্যন্ত সতর্কতার সাথে তাদের ঠিকানা গোপন রাখছেন। তারা সরাসরি নিজেদের নামে সম্পত্তি না কিনে লিমিটেড লায়াবিলিটি কোম্পানি (LLC), প্রাইভেসি ট্রাস্ট এবং তথাকথিত 'হুইসপার' লিস্টিংয়ের মাধ্যমে লেনদেন করছেন। এই ধরনের লিস্টিংগুলো সাধারণ রিয়েল এস্টেট সার্ভিসে (MLS) কখনোই প্রকাশ করা হয় না। তাদের মূল লক্ষ্য সেরা দাম পাওয়া নয়, বরং নিজেদের পরিচয় গোপন রাখা এবং নিরাপত্তার ঝুঁকি কমানো।

ডিলেয়নের মতে, প্রায় তিন বছর আগে এই পরিবর্তন শুরু হয় যখন টেক কোম্পানিগুলোর বাজারমূল্য পুনরায় বাড়তে থাকে। তবে গত এক বছরে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই-এর উত্থানে একদিকে যেমন প্রচুর সম্পদ তৈরি হয়েছে, অন্যদিকে এই প্রযুক্তিটি ব্যাপক বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। ফলে ধনীদের মধ্যে ব্যক্তিগত নিরাপত্তার উদ্বেগ এবং গোপনীয়তার আকাঙ্ক্ষা আরও বেড়েছে। উদাহরণস্বরূপ, ওপেনএআই-এর সিইও স্যাম অল্টম্যানের বাড়িতে হামলা এবং অগ্নিসংযোগের মতো ঘটনা অনেক ধনকুবেরকে জনসমক্ষ থেকে দূরে থাকতে উৎসাহিত করেছে।

এই গোপন লেনদেনের পদ্ধতি সাধারণ বিক্রয়ের চেয়ে সম্পূর্ণ আলাদা। এখানে কোনো বিজ্ঞাপন, ওপেন হাউস বা বাড়ির সামনে কোনো সাইনবোর্ড থাকে না। কেবল ৩ থেকে ৫ জন অভিজাত ব্রোকারের মধ্যে এই তথ্যের আদান-প্রদান হয়। এমনকি অনেক ক্ষেত্রে এলএলসি-র ম্যানেজার হিসেবে এমন কাউকে নিয়োগ দেওয়া হয়, যার সাথে মালিকের সরাসরি কোনো সম্পর্ক নেই (যেমন ব্যক্তিগত আইনজীবী নন), যাতে সরকারি রেকর্ড ঘেঁটেও আসল মালিকের পরিচয় বের করা না যায়। এমনকি ইউটিলিটি বিল পরিশোধ বা ছোটখাটো পার্সেল ডেলিভারির ক্ষেত্রেও ব্যক্তিগত নামের বদলে এলএলসি বা ট্রাস্টের নাম ব্যবহার করা হয়।

এই প্রক্রিয়ায় রিয়েল এস্টেট এজেন্টদের ভূমিকাও বদলেছে। তারা এখন ক্রেতা ও বিক্রেতার মাঝে একটি ঢাল হিসেবে কাজ করেন। ভেন্ডরদের সাথে দেখা করা থেকে শুরু করে ইন্সপেকশনের কাজ সম্পন্ন করা পর্যন্ত সবকিছু এজেন্ট সামলান, যাতে আসল মালিকের পরিচয় প্রকাশ না পায়। অনেক সময় ক্রেতা এবং বিক্রেতা উভয়েই একে অপরের পরিচয় গোপন রাখেন।

তবে এই গোপনীয়তা বজায় রাখার একটি আর্থিক মূল্য দিতে হয়। যেহেতু ওপেন মার্কেটে বিজ্ঞাপন দেওয়া হয় না, তাই ক্রেতার সংখ্যা সীমিত থাকে এবং প্রতিযোগিতার অভাবের কারণে বিক্রয়মূল্য কমে যায়। জিলোর (Zillow) একটি গবেষণা অনুযায়ী, ২০২৩ ও ২০২৪ সালে অফ-মার্কেট বিক্রিত বাড়িগুলোর দাম সাধারণ লিস্টিংয়ের চেয়ে গড়ে প্রায় ৫,০০০ ডলার কম ছিল। ক্যালিফোর্নিয়ায় এই ব্যবধান আরও বেশি, গড়ে প্রায় ৩০,০৭৫ ডলার।

এতদসত্ত্বেও অনেক রিয়েল এস্টেট প্রতিষ্ঠান এই অফ-মার্কেট বিক্রয়কে উৎসাহিত করে। কেন ডিলেয়নের মতে, অনেক ব্রোকারেজ হাউস মালিকের গোপনীয়তার চেয়ে নিজেদের মার্কেটিং খরচ কমাতে এবং দ্বিগুণ কমিশন পাওয়ার লোভে এই পদ্ধতি প্রচার করে। তবে বিক্রেতারা যদি বুঝতে পারেন যে গোপনীয়তার কারণে তারা বড় অংকের আর্থিক ক্ষতি করছেন, তবে তারা পুনরায় প্রকাশ্য বাজারের দিকে ঝুঁকতে পারেন।