খবরের কাগজ বা অনলাইন পোর্টালে প্রায়ই দেখা যায়—কোনো ধূমকেতু ৮০ বছর পর ফিরছে কিংবা কোনো গ্রহের বিন্যাস ১০০ বছর পর দেখা যাবে। এই ধরনের চমকপ্রদ শিরোনাম পড়ে অনেকের মনে প্রশ্ন জাগে, গত বছর যে ঘটনাটিকে 'শতাধিক বছরের বিরল ঘটনা' বলা হয়েছিল, তার ঠিক পরের বছরই কেন মহাকাশে অনুরূপ দৃশ্য দেখা যাচ্ছে? এই ধাঁধার সমাধান লুকিয়ে আছে মহাজাগতিক ঘটনার প্রকৃতি এবং পৃথিবী থেকে তা দেখার সুযোগের পার্থক্যের মধ্যে। মহাকাশে একটি ঘটনা কতবার ঘটছে আর পৃথিবীর নির্দিষ্ট কোনো স্থান থেকে সেটি কতবার দৃশ্যমান হচ্ছে, এই দুটি বিষয় সম্পূর্ণ আলাদা।
সূর্যগ্রহণের বিষয়টি এখানে সবচেয়ে প্রাসঙ্গিক উদাহরণ। ২০২৪ সালের ৮ এপ্রিল উত্তর আমেরিকার কিছু অংশে পূর্ণ সূর্যগ্রহণ দেখা গিয়েছিল, আবার ২০২৬ সালের ১২ আগস্ট গ্রিনল্যান্ড, আইসল্যান্ড ও স্পেনের কিছু অঞ্চল থেকে একই ধরনের দৃশ্য দেখা গেছে। অর্থাৎ, পূর্ণ সূর্যগ্রহণের জন্য শত বছরের অপেক্ষা করতে হয়নি। তবে লক্ষণীয় বিষয় হলো, দুটি গ্রহণের দৃশ্য দেখার স্থান এক ছিল না। পূর্ণ সূর্যগ্রহণের সময় চাঁদের ছায়া পৃথিবীর বুকে যে সরু পথ তৈরি করে, কেবল সেই নির্দিষ্ট এলাকার মানুষই পূর্ণ গ্রহণের সাক্ষী হতে পারেন। তাই পৃথিবীর কোনো নির্দিষ্ট শহর বা অঞ্চলের মানুষের জন্য পূর্ণ সূর্যগ্রহণ দেখার সুযোগ আসতে কয়েক দশক বা এক শতাব্দীও সময় লাগতে পারে, যদিও সেই সময়ে পৃথিবীর অন্য প্রান্তে একাধিকবার পূর্ণ সূর্যগ্রহণ ঘটে থাকে।
বিজ্ঞানে সূর্যগ্রহণের এই পুনরাবৃত্তির একটি নির্দিষ্ট ছন্দ রয়েছে, যাকে 'সারোস চক্র' বলা হয়। প্রতি ১৮ বছর ১১ দিন ৮ ঘণ্টা পর সূর্য, পৃথিবী ও চাঁদ পুনরায় একই অবস্থানে ফিরে আসে, যার ফলে একই ধরনের গ্রহণ ঘটার সম্ভাবনা তৈরি হয়। কিন্তু পৃথিবীর নিজ অক্ষের ঘূর্ণনের কারণে এবং সারোস চক্রের অতিরিক্ত ৮ ঘণ্টার প্রভাবে, পরবর্তী গ্রহণের ছায়াপথ আগেরবারের তুলনায় প্রায় ১২০ ডিগ্রি পশ্চিমে সরে যায়। ফলে গ্রহণের ধরন এক থাকলেও তা দেখার ভৌগোলিক অবস্থান সম্পূর্ণ বদলে যায়। উদাহরণস্বরূপ, ২০২৬ সালের পর ২০২৭ সালের ২ আগস্ট আবারও একটি পূর্ণ সূর্যগ্রহণ হবে, যা দক্ষিণ স্পেন, উত্তর আফ্রিকা ও মধ্যপ্রাচ্যের কিছু অংশে দেখা যাবে।
তবে সব মহাজাগতিক ঘটনাই প্রতিবছর ঘটে না। হ্যালির ধূমকেতুর ক্ষেত্রে সংবাদমাধ্যমের দীর্ঘ বিরতির দাবি সঠিক। সূর্যকে একবার প্রদক্ষিণ করতে এই ধূমকেতুর গড়ে ৭৬ বছর সময় লাগে। ১৯১০ এবং ১৯৮৬ সালের পর এটি ২০৬১ সালে পুনরায় দেখা যাবে। সাধারণ উজ্জ্বল ধূমকেতু এবং হ্যালির ধূমকেতুর মধ্যে এই মৌলিক পার্থক্য বিদ্যমান।
অন্যদিকে, গ্রহদের বিশেষ বিন্যাস বা সারিবদ্ধভাবে দেখার ঘটনাটি মূলত পৃথিবীর দৃষ্টিকোণ বা অ্যাঙ্গেলের ওপর নির্ভর করে। গ্রহগুলো প্রকৃতপক্ষে এক সরলরেখায় থাকে না, তবে পৃথিবী থেকে দেখলে মনে হয় তারা খুব কাছাকাছি। প্রতিটি গ্রহের কক্ষপথ এবং গতির ভিন্নতার কারণে এই বিশেষ বিন্যাস পুনরায় ফিরে আসতে সত্যিই দীর্ঘ সময় লাগতে পারে।
তাই মহাজাগতিক ঘটনার ক্ষেত্রে '১০০ বছরে একবার' এমন চটকদার শিরোনাম দেখে বিভ্রান্ত না হয়ে তিনটি বিষয় খেয়াল করা প্রয়োজন: প্রথমত, ঘটনাটি কি বিশ্বব্যাপী নাকি নির্দিষ্ট কোনো অঞ্চল থেকে দেখা যাবে? দ্বিতীয়ত, 'একবার' বলতে কি একই বস্তু নাকি একই ধরনের ঘটনার কথা বলা হচ্ছে? এবং তৃতীয়ত, বিজ্ঞানীদের হিসাব অনুযায়ী এর প্রকৃত পুনরাবৃত্তি কবে? সংবাদমাধ্যম অনেক সময় পাঠকদের আকর্ষণ করতে কৌশলী শিরোনাম ব্যবহার করে, তবে বিজ্ঞান সচেতনতা থাকলে এই রহস্য সহজেই বোঝা সম্ভব।




