রংপুরের তারাগঞ্জের ইকরচালী হাটের এক কাপড়ের দোকানে বসে জীবনবৃত্তান্তের খাতা ঘাটছেন এশরা বেগম। এখানে তিনি কেবল কাপড় কেনাবেচায় সীমাবদ্ধ নন, বরং তিনি এই এলাকার একজন পরিচিত ঘটক। দীর্ঘ ২৮ বছর ধরে এই পেশার সাথে যুক্ত থেকে এশরা বেগম এখন পর্যন্ত চার শতাধিক বিয়ে সম্পন্ন করিয়েছেন, যার মধ্যে ৩০টি বিয়ে হিন্দু সম্প্রদায়ের।

ঘটকালির জগতে তাঁর প্রবেশ ঘটেছিল ১৯৯৬ সালে। সে সময় শহরের কাপড় ব্যবসায়ী রেজাউলের জন্য পাত্রী খোঁজার দায়িত্ব দেন পরিচিত ঘটক নজরুল ইসলাম। উত্তরপাড়ার বিজলী বেগমের সাথে রেজাউলের বিয়ের সম্বন্ধ করিয়ে দেওয়ার মাধ্যমেই এশরার পেশাদার জীবন শুরু হয়। তবে শুরুর পথটি সহজ ছিল না; প্রথম চারটি চেষ্টা ব্যর্থ হওয়ার পর পঞ্চম প্রচেষ্টায় তিনি সফল হন। এরপরই তিনি নিয়মিতভাবে এই কাজে আত্মনিয়োগ করেন। সময়ের সাথে সাথে তাঁর খ্যাতি ছড়িয়ে পড়ে এবং মানুষ তাঁর কাছে পাত্র-পাত্রীর খোঁজ করতে শুরু করে। অনেক ক্ষেত্রে তিনি এক পরিবারের দুই প্রজন্মের বিয়ের সম্বন্ধ করিয়ে দিয়েছেন, যা তাঁর কাছে সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি হিসেবে গণ্য হয়।

তবে সময়ের সাথে সাথে বিয়ের ধরন এবং পাত্র-পাত্রী নির্বাচনের মানদণ্ড বদলেছে বলে মনে করেন এশরা। আগে পরিবারের বড়দের সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত হতো এবং মেয়ের মতামতের গুরুত্ব ছিল কম। এখন পরিস্থিতি ভিন্ন; পরিবারের পছন্দ হলেও পাত্রী পছন্দ না করলে বিয়ে হয় না। বর্তমান সময়ে কর্মসংস্থান, সচ্ছলতা এবং পেশাগত যোগ্যতাকে সবচেয়ে বেশি প্রাধান্য দেওয়া হয়। এর ফলে দুই পক্ষের চাহিদা মেলানো এবং সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি সময় ও পরিশ্রম করতে হয়।

পেশাগত জীবনের এই দীর্ঘ পথচলায় আর্থিক ও মানসিক ক্ষতির অভিজ্ঞতাও তাঁর আছে। বিশেষ করে ২০২২ সালে করোনা মহামারির পরবর্তী সময়ে আয়ের সুযোগ কমে যায়। অনেক ক্ষেত্রে নিজের পকেট থেকে যাতায়াত খরচ বহন করার পর দেখা যায়, দুই পক্ষ তাঁর সাথে যোগাযোগ না করেই গোপনে বিয়ে করে ফেলেছে। এভাবে অনেকবার সম্মানী থেকে বঞ্চিত হয়েছেন তিনি। এশরা জানান, বর্তমান যুগে ফেসবুক ও মোবাইল ফোনের সহজলভ্যতার কারণে প্রেমের বিয়ে বেড়েছে এবং মানুষ নিজেরাই একে অপরের খোঁজ পায়, ফলে পেশাদার ঘটকের প্রয়োজনীয়তা আগের চেয়ে অনেক কমে গেছে।

ব্যক্তিগত জীবন কথালে, ১৯৬০ সালে তারাগঞ্জের মাটিয়ালপাড়ায় জন্ম নেওয়া এশরার বিয়ে হয়েছিল মাত্র ১৫ বছর বয়সে। তাঁর স্বামী আলিমুদ্দিন ভ্যান চালিয়ে সংসার চালাতেন, তবে ভ্যানটি চুরি হয়ে যাওয়ার পর সংসারে চরম অভাব নেমে আসে। সেই প্রতিকূল সময়েই তিনি নিজের পায়ে দাঁড়ানোর চেষ্টা করেন। শুরুতে নারীদের এই পেশায় আসার কারণে সমাজের কিছু মানুষ কটূক্তি করলেও, এখন তিনি এলাকার মানুষের শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা পান। বর্তমানে এই পেশা থেকে আয় অত্যন্ত সীমিত। কোনো বিয়ে সম্পন্ন হলে ১০ থেকে ১৫ হাজার টাকা পাওয়া গেলেও, অনেক সময় দেখা করানোর পর মাত্র ৩০০ বা ৫০০ টাকা দেওয়া হয়। তবুও বেঁচে থাকা পর্যন্ত মানুষের মাঝে সম্পর্কের সেতু গড়ে তোলার নেশায় এই কাজ চালিয়ে যেতে চান এশরা বেগম।