সাম্প্রতিক সময়ে শরীর থেকে টক্সিন বা ক্ষতিকর পদার্থ দূর করতে অর্থাৎ লিভার ‘ডিটক্স’ করার জন্য কফি এনেমা পদ্ধতিটি ব্যাপক জনপ্রিয়তা পেয়েছে। বিশেষ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এই প্রক্রিয়ার পক্ষে-বিপক্ষে প্রচুর আলোচনা চলছে। তবে এই ট্রেন্ড অনুসরণ করে কফি এনেমা নেওয়ার পর অনেকেই গুরুতর শারীরিক জটিলতায় আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হচ্ছেন। এই বিষয়ে সিলেট ইবনে সিনা হাসপাতালের কনসালট্যান্ট সার্জন ডা. রেজা আহমদ বিস্তারিত ব্যাখ্যা দিয়েছেন।

প্রথমে জানতে হবে এনেমা আসলে কী। সহজ কথায়, পায়ুপথে বিশেষ তরল প্রবেশ করিয়ে অন্ত্র পরিষ্কার করার পদ্ধতিই হলো এনেমা। সাধারণত চিকিৎসকরা নির্দিষ্ট কিছু প্রয়োজনে অন্ত্রের জমে থাকা মল পরিষ্কার করতে এই পদ্ধতি ব্যবহারের পরামর্শ দেন এবং ফার্মেসিতে চিকিৎসাবিজ্ঞানে স্বীকৃত এনেমা বোতল পাওয়া যায়। তবে চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া এটি ব্যবহার করা ঝুঁকিপূর্ণ। বর্তমানে অনেকে বাড়িতেই কফি ব্যবহার করে এই পদ্ধতি চেষ্টা করছেন, যা চিকিৎসাবিজ্ঞানের প্রচলিত এনেমার সাথে সম্পূর্ণ আলাদা, কারণ প্রকৃত চিকিৎসায় ব্যবহৃত কোনো এনেমায় কফি থাকে না।

কফি এনেমা গ্রহণের ঝুঁকিগুলো অত্যন্ত উদ্বেগজনক। আন্তর্জাতিক গবেষণাপত্রে এই পদ্ধতির কারণে দুই ব্যক্তির মৃত্যুর খবর প্রকাশিত হয়েছে। যদিও মৃত্যুর ঝুঁকি খুব কম, তবে এর ফলে সৃষ্ট জটিলতা একজন মানুষকে চরম ভোগান্তির মুখে ফেলতে পারে। এই প্রক্রিয়ায় অন্ত্র থেকে মল ও স্বাভাবিক তরল বেরিয়ে যায়, যার ফলে শরীরের প্রয়োজনীয় খনিজ উপাদানের ঘাটতি দেখা দেয় এবং মারাত্মক পানিশূন্যতা ও লবণের ভারসাম্য নষ্ট হতে পারে।

শারীরিক আঘাতের ঝুঁকিও এখানে প্রবল। এনেমা দেওয়ার সময় পায়ুপথ, মলদ্বার বা অন্ত্রের দেওয়ালে আঘাত লেগে ক্ষত সৃষ্টি হতে পারে, যা তীব্র ব্যথার কারণ হয়। বিশেষ করে গরম কফি ব্যবহার করলে অভ্যন্তরীণ অঙ্গ পুড়ে যাওয়ার বা ‘স্ক্যাল্ড’ হওয়ার সম্ভাবনা থাকে, যার ফলে মলদ্বার সরু হয়ে যেতে পারে (রেক্টাল স্ট্রিকচার)। এছাড়া বারবার এই পদ্ধতি ব্যবহার করলে মলদ্বারের পেশির স্বাভাবিক কার্যক্ষমতা হ্রাস পেয়ে দীর্ঘমেয়াদী কোষ্ঠকাঠিন্য হতে পারে।

সংক্রমণের ঝুঁকিও এখানে বিদ্যমান। বাইরের মাধ্যমে জীবাণু শরীরে প্রবেশ করে রক্তে ছড়িয়ে পড়তে পারে (সেপটিসেমিয়া)। পাশাপাশি, অন্ত্রের উপকারী ব্যাকটেরিয়াগুলো বেরিয়ে যাওয়ার ফলে ক্ষতিকর জীবাণুর আক্রমণ সহজ হয়ে যায়। এছাড়া মুখে কফি খাওয়ার চেয়ে পায়ুপথে গ্রহণে রক্তে অনেক বেশি ক্যাফেইন শোষিত হয়, যা বুক ধড়ফড় করা, মাথাব্যথা এবং চরম অস্থিরতার সৃষ্টি করে।

এত ঝুঁকি থাকা সত্ত্বেও কেন এটি জনপ্রিয়? ডা. রেজা আহমদের মতে, কফিতে থাকা ক্যাফেইন রক্তে মিশলে সাময়িকভাবে শরীর সতেজ ও উদ্যমী মনে হয়। এছাড়া মল ত্যাগের ফলে তাৎক্ষণিক স্বস্তি এবং পুরুষদের ক্ষেত্রে প্রোস্টেট গ্রন্থিতে চাপের কারণে এক ধরনের ভালো লাগার অনুভূতি তৈরি হয়। এছাড়া বিশ্বাসের কারণে অনেকে মানসিক প্রশান্তি অনুভব করেন। তবে লিভার ডিটক্স করার ক্ষেত্রে এর কোনো শক্ত বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই।

চিকিৎসাবিজ্ঞানের চূড়ান্ত মতামত হলো, শরীরের কোনো অঙ্গ আলাদা করে ডিটক্স করার প্রয়োজন নেই। আমাদের লিভার এবং কিডনি স্বাভাবিক শারীরবৃত্তীয় প্রক্রিয়ায় শরীর থেকে ক্ষতিকর পদার্থ বের করে দেয়। এমনকি যাদের লিভার বা কিডনি বিকল, তাদের ক্ষেত্রেও এই ধরনের ঘরোয়া ডিটক্স পদ্ধতি কোনো উপকারে আসে না, বরং ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়।