জোনাকি পোকা এখন প্রায় চোখেই পড়ে না। এক প্রজন্ম আগেও গ্রামীণ অন্ধকারে এদের মিটিমিটি আলো দেখা যেত। কিন্তু বর্তমান প্রজন্মের অনেকেই কেবল বই বা ইন্টারনেটে জোনাকির ছবি দেখে পরিচিত। কয়েক বছর আগে একটি পোস্টে দাবি করা হয়েছিল, যারা জোনাকি দেখেছে তারাই শেষ প্রজন্ম। পুরোপুরি সত্য না হলেও বিজ্ঞানীরা স্বীকার করছেন, বিশ্বের অনেক অঞ্চলেই জোনাকির সংখ্যা উদ্বেগজনক হারে কমছে।

জোনাকির আলো তৈরি প্রক্রিয়াটি অত্যন্ত বিস্ময়কর। এদের শরীরে লুসিফেরিন নামক এক রাসায়নিক পদার্থ ও লুসিফারেজ নামক একটি এনজাইমের বিক্রিয়ায় আলো উৎপন্ন হয়। অক্সিজেনের উপস্থিতিতে এই বিক্রিয়া ঘটে, কিন্তু আলোটি উত্তপ্ত নয়। জোনাকি শরীরে অক্সিজেনের প্রবাহ নিয়ন্ত্রণ করে আলো জ্বালানো বা নিভিয়ে দিতে পারে। এই আলো মূলত যোগাযোগের একটি মাধ্যম। পুরুষ জোনাকি নির্দিষ্ট ছন্দে আলো জ্বালিয়ে স্ত্রীকে আকর্ষণ করে, আর স্ত্রী সেই সংকেত বুঝে সাড়া দেয়। কিছু প্রজাতির লার্ভাও আলো তৈরি করে, যা শিকারিদের সতর্ক করে দেয়। তবে সব জোনাকি আলো ব্যবহার করে না; কিছু প্রজাতি সঙ্গী খুঁজতে গন্ধের ওপর নির্ভর করে।

কেন কমছে জোনাকি? এর পেছনে একাধিক কারণ চিহ্নিত করেছেন বিজ্ঞানীরা। প্রথমত, আবাসস্থল ধ্বংস হচ্ছে। পুকুর, নদী বা জলাভূমির ধারের ঝোপঝাড় কেটে সেখানে নির্মাণ করা হচ্ছে। জোনাকির লার্ভা মাটির নিচে, ঝরা পাতার স্তূপে বা স্যাঁতসেঁতে জায়গায় এক থেকে কয়েক বছর পর্যন্ত থাকে। এই পরিবেশ নষ্ট হলে তারা বাঁচতে পারে না। দ্বিতীয়ত, কৃষিতে কীটনাশকের অতিরিক্ত ব্যবহার। কীটনাশক সরাসরি জোনাকির ক্ষতি করে, আবার শামুক, কেঁচো, ছোট পোকা—যা জোনাকির খাদ্য—তাও কমিয়ে দেয়। তৃতীয়ত, কৃত্রিম আলোর দূষণ। রাতের বাতি, রাস্তার আলো, গাড়ির হেডলাইট জোনাকির আলোর সংকেতকে ঢেকে দেয়, ফলে সঙ্গী খুঁজে পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। চতুর্থত, জলবায়ু পরিবর্তন। অতিরিক্ত গরম, খরা বা দীর্ঘ শুকনো মৌসুম জোনাকির প্রজনন ও বেঁচে থাকাকে ব্যাহত করে। এছাড়াও, আমরা আমাদের বাগান ঝরা পাতা ঝেড়ে সম্পূর্ণ পরিষ্কার করে ফেলি, যার ফলে লার্ভাদের আশ্রয় নষ্ট হয়।

জোনাকি সংরক্ষণে কী করা যেতে পারে? ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যার প্রাক্তন শিক্ষার্থী নিলয় হাওলাদার, যিনি এখন ইতালির পাদোভা বিশ্ববিদ্যালয়ে বিবর্তনীয় জীববিজ্ঞানে গবেষণা করছেন, তিনি জানান, খুব বড় কোনো উদ্যোগের প্রয়োজন নেই। তিনি বলেন, 'বাড়ির আশপাশে কিছু গাছপালা ও ঝোপঝাড় থাকতে দেওয়া, অকারণ কীটনাশক ব্যবহার না করা এবং রাতের অপ্রয়োজনীয় আলো কমানো—এসবই যথেষ্ট। ঝরা পাতার সবটুকু পরিষ্কার না করে কিছু জায়গা স্বাভাবিক রাখলে জোনাকির লার্ভা ও অন্যান্য ছোট প্রাণী আশ্রয় পাবে। আর জোনাকি দেখলে ধরার বদলে দূর থেকে দেখলেই তারা নিরাপদ থাকবে।' প্রকৃতির এই ছোট্ট আলোর দীপকে রক্ষা করতে আমাদের দৈনন্দিন অভ্যাসে সামান্য পরিবর্তনই যথেষ্ট হতে পারে।