বঙ্গোপসাগরের সংলগ্ন মেঘনা নদীর মোহনায় গড়ে ওঠা চরগুলো এখন পরিযায়ী জলচর পাখির প্রধান আশ্রয়স্থল হয়ে উঠেছে। নোয়াখালী জেলার জাহাইজ্জার চর, ডোবাচর, ভাসানচর, ঠেঙ্গারচর, গাঙ্গুইরার চর, ইসলাম চর ও কেয়ারিং চরে সম্প্রতি পরিচালিত এক জরিপে মোট ৫২ প্রজাতির জলচর পাখি নথিভুক্ত হয়েছে। এর মধ্যে ৪৬ প্রজাতিই পরিযায়ী এবং বৈশ্বিকভাবে সংকটাপন্ন ১৪ প্রজাতির অস্তিত্ব ধরা পড়েছে। বিশ্বব্যাংকের আর্থিক সহায়তায় বন অধিদপ্তর ও প্রকৃতি সংরক্ষণ সংস্থা নেচার কনজারভেশন ম্যানেজমেন্ট (নেকম) ২০২৫ সালের নভেম্বর থেকে ২০২৬ সালের এপ্রিল পর্যন্ত পাঁচ দফায় এই জরিপ কার্যক্রম চালায়।

জরিপের সময় বৈশ্বিকভাবে মহাবিপন্ন চামচঠুঁটো বাটানের একটি পাখি গাঙ্গুইরার চরে দেখা গেছে, যা ডিসেম্বর ২০২৫ সালে নজরে আসে। পৃথিবীতে বর্তমানে মাত্র ২৮০ থেকে ৬২০টি চামচঠুঁটো বাটান টিকে আছে বলে ধারণা করা হয়। এর আগে ২০১৫-১৬ সালে 'স্পুন-বিল্ড স্যান্ডপাইপার কনজারভেশন প্রজেক্ট'-এর গবেষণায় একই এলাকায় ৪৮টি চামচঠুঁটো বাটান পাওয়া গিয়েছিল, তবে সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশের উপকূলে এ প্রজাতির উপস্থিতি উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। মেঘনার চরগুলোতে পাওয়া অন্যান্য বৈশ্বিকভাবে বিপন্ন পাখির মধ্যে রয়েছে দেশি গাঙচষা, বড় নট, মেটে জিরিয়া, গুলিন্দা বাটান, মোটাঠুঁটো বাটান, ইউরেশীয় গুলিন্দা, কালোলেজ জৌরালি, দাগিলেজ জৌরালি, এশিয়ান ডউইচার, ডানলিন, কালোমাথা কাস্তেচরা, রাঙা মানিকজোড় এবং লাল নুড়িবাটান।

২০২৬ সালের জানুয়ারিতে সাতটি চরে একসঙ্গে ৩২ হাজারের বেশি পাখি দেখা গেছে। এর মধ্যে গাঙ্গুইরার চরে সবচেয়ে বেশি সংখ্যক পাখির উপস্থিতি লক্ষ করা হয়েছে, অন্যদিকে জাহাইজ্জার চরে সবচেয়ে বেশি প্রজাতির বৈচিত্র্য নথিভুক্ত হয়েছে। গবেষকদের নজরে এসেছে ডোবাচর নামের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ পাখির আবাসস্থল, যেখানে ১২ হাজারের বেশি পাখি পরিলক্ষিত হয়েছে। বিশ্বব্যাপী বিপন্ন দেশি গাঙচষার একটি বড় ঝাঁক (১,৩৩৮টি) নিয়মিতভাবে এই চরগুলোতে দেখা যাচ্ছে, যা সমগ্র বিশ্বে মাত্র ২ হাজার ৪৫০ থেকে ২ হাজার ৯০০ পর্যন্ত টিকে আছে। এছাড়াও সংকটাপন্ন ৯ হাজার কালোলেজ জৌরালি এবং ১ হাজার ৫০৭টি ইউরেশীয় গুলিন্দার সন্ধান পাওয়া গেছে, যা এই চরগুলোর বৈশ্বিক গুরুত্বকে আরও স্পষ্ট করে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের সাবেক অধ্যাপক ও নেকমের চেয়ারম্যান আবদুর রব মোল্লা বলেন, শীতকাল জুড়ে এবং গরমের শুরু পর্যন্ত ছয় মাস ধরে এই গবেষণা পরিচালিত হয়। গবেষণার ফলাফল ইঙ্গিত দেয় যে, গাঙ্গেয় বদ্বীপের চরগুলো পরিযায়ী পাখির টিকে থাকার জন্য আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত গুরুত্বপূর্ণ এলাকা। নেকমের বন্য প্রাণী গবেষক শোয়েব আলী উল্লেখ করেন, গঙ্গা, ব্রহ্মপুত্র ও মেঘনা বদ্বীপের প্রভাবে উপকূলীয় কাদামাটি চরে কেঁচো, কাঁকড়া, শামুক, ঝিনুকসহ বিভিন্ন অমেরুদণ্ডী প্রাণী এবং প্রচুর মাছের সমারোহ ঘটে, ফলে এসব এলাকা জলচর পরিযায়ী পাখির খাদ্য সংগ্রহ ও বিচরণের জন্য আদর্শ।

নেকমের আরেক গবেষক নাঈম খন্দকার বলেন, মেঘনার চরগুলোতে কৃষিকাজ ও গোচারণের সাথে জড়িত মানুষের অবাধ বিচরণ নিয়ন্ত্রণ করা অত্যন্ত জরুরি। কারণ তাঁদের মধ্যে অনেকেই সুযোগ পেলে পাখি শিকার করে থাকেন। মাছ ধরতে ব্যবহৃত চরপাটা জালও পাখির বিচরণভূমি সংকুচিত করছে। এই সমস্যাগুলো মোকাবিলার লক্ষ্যে প্রকল্পের আওতায় ১০ বছর মেয়াদী একটি সংরক্ষণ কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন করা হয়েছে।