পৃথিবীর ইতিহাসে প্রথমবারের মতো সবচেয়ে উষ্ণ মাস হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে ২০২৬ সালের আগস্ট। ইউরোপীয় জলবায়ু সংস্থা কোপার্নিকাসের সাম্প্রতিক তথ্যানুসারে, গত মাসে বিশ্বের গড় তাপমাত্রা দাঁড়িয়েছে ১৬.৯৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস। যদিও এই সংখ্যাটি আপাতদৃষ্টিতে কম মনে হতে পারে, তবে মেরু অঞ্চলের শীতলতা এবং দিন-রাতের গড় হিসাব মিলিয়ে এটি বিজ্ঞানীদের জন্য চরম উদ্বেগের সংকেত। এই তাপমাত্রা গত বছরের জুলাই মাসের সর্বোচ্চ রেকর্ডের সমান। উল্লেখ্য, গত বছরের জুলাই থেকে শুরু করে টানা আট মাস ধরে উষ্ণতার নতুন নতুন রেকর্ড তৈরি হচ্ছে।

জলবায়ু বিজ্ঞানীদের মতে, এই ভয়াবহ উষ্ণতার পেছনে দুটি প্রধান কারণ কাজ করছে—প্রাকৃতিক এল নিনো এবং মানুষের তৈরি জলবায়ু পরিবর্তন। তবে ইম্পেরিয়াল কলেজ লন্ডনের বিজ্ঞানী ফ্রেডেরিক অটো স্পষ্ট করে জানিয়েছেন, এল নিনো কেবল তাপমাত্রায় সামান্য (০.১ থেকে ০.২ ডিগ্রি সেলসিয়াস) প্রভাব ফেলে। আসল বিপর্যয়ের কারণ হলো কয়লা, তেল এবং গ্যাসের মতো জীবাশ্ম জ্বালানির লাগামহীন ব্যবহার।

টেক্সাস এঅ্যান্ডএম ইউনিভার্সিটির বিজ্ঞানী অ্যান্ড্রু ডেসলার এই পরিস্থিতি নিয়ে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। তিনি মনে করেন, কয়েক দশক আগেই তাপমাত্রা বৃদ্ধির এই পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছিল, তবুও বিশ্ববাসী কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নেয়নি। তিনি বর্তমান অবস্থাকে একটি দ্রুতগামী ট্রেনের সাথে তুলনা করে বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের ট্রেনটি আমাদের পিষে ফেলতে আসছে, কিন্তু আমরা কেবল রেললাইনের ওপর দাঁড়িয়ে সেটি দেখছি।

২০১৫ সালের প্যারিস জলবায়ু চুক্তিতে পৃথিবীর তাপমাত্রা প্রাক-শিল্পযুগের তুলনায় ১.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি না বাড়ানোর লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল। কিন্তু বিদায়ী আগস্ট মাসে এই সীমা ছাড়িয়ে তাপমাত্রা ১.৬৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছে।

কোপার্নিকাসের জলবায়ু প্রধান সামান্থা বার্জেস জানিয়েছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব এখন আর দূরবর্তী কোনো দ্বীপ বা মেরু অঞ্চলের বরফ গলার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; এটি সরাসরি মানুষের প্রাত্যহিক জীবনে আঘাত হানছে। তীব্র দাবদাহের ফলে স্কুল বন্ধ হচ্ছে, হিটস্ট্রোকে হাসপাতালগুলো ভরে যাচ্ছে, এমনকি অতিরিক্ত তাপে পিচঢালা রাস্তা গলে যাওয়া এবং রেললাইন বেঁকে যাওয়ার মতো ঘটনা ঘটছে। শুধু ডাঙায় নয়, সমুদ্রের তলদেশেও তাণ্ডব চলছে; গত ২২ আগস্ট ছিল সমুদ্রের ইতিহাসে সবচেয়ে উষ্ণ দিন।

ভবিষ্যৎ পরিস্থিতি আরও আশঙ্কাজনক। বার্কলে আর্থ-এর বিজ্ঞানী জেকে হাউসফাদার পূর্বাভাস দিয়েছেন যে, ২০২৬ এবং ২০২৭ সালে তাপমাত্রার রেকর্ড আরও বাড়বে। বিশেষ করে ২০২৭ সালে প্রাক-শিল্পযুগের চেয়ে তাপমাত্রা ১.৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত বৃদ্ধি পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। জাতিসংঘের জলবায়ু প্রধান সাইমন স্টিয়েল একে জীবাশ্ম জ্বালানির প্রতি মানুষের আসক্তির চরম মূল্য হিসেবে অভিহিত করেছেন। তিনি সতর্ক করেছেন যে, এখনই সতর্ক না হলে এই চরম আবহাওয়া লাখ লাখ মানুষের প্রাণহানির পাশাপাশি বৈশ্বিক অর্থনীতিকে পঙ্গু করবে এবং খাদ্যসংকটের মাধ্যমে নিত্যপণ্যের দাম সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে নিয়ে যাবে।