বাঙালির উৎসব ও আভিজাত্যের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে টাঙ্গাইলের তাঁত শাড়ি। এর অনন্য বুনন, আরাম এবং শৈল্পিক নকশার কারণে দেশ ও বিদেশে এই শাড়ির ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। বিশেষ করে ২০২৪ সালে ভৌগোলিক নির্দেশক (জিআই) পণ্যের স্বীকৃতি পাওয়ার পর ২০২৫ সালের ৯ ডিসেম্বর নয়াদিল্লির লালকেল্লায় অনুষ্ঠিত অধিবেশনে ইউনেস্কোর ‘রিপ্রেজেন্টেটিভ লিস্ট অব দ্য ইনট্যানজিবল কালচারাল হেরিটেজ অব হিউম্যানিটি’-তে আনুষ্ঠানিকভাবে অন্তর্ভুক্ত হয় টাঙ্গাইলের বয়নশিল্প। এর মাধ্যমে বাংলাদেশের ষষ্ঠ অমূর্ত সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য হিসেবে বিশ্বমঞ্চে জায়গা করে নেয় এই শিল্প।

টাঙ্গাইল শাড়ির অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো এর মিহি বুনন এবং স্থায়িত্ব। ডিজাইনার ফারহানা হামিদ ও ঊর্মিলা শুক্লার মতে, এই শাড়িগুলো যেমন পরতে আরামদায়ক, তেমনি যথেষ্ট মজবুত হয়। এছাড়া এর পাড়ের বিশেষ নকশা এবং জমিনের বুটি এই শাড়িকে অনন্য করে তোলে। ঐতিহ্যগতভাবে টাঙ্গাইল শাড়িতে বুটির কাজ বেশি থাকলেও সময়ের সাথে সাথে এতে এসেছে ব্যাপক পরিবর্তন। আগে পাড় ও আঁচল ছোট থাকলেও এখনকার শাড়িতে আধুনিক নকশার আঁচল যুক্ত করা হয়েছে। বর্তমানে এই শাড়ির দৈর্ঘ্য ব্লাউজ পিসসহ প্রায় ১৪ হাত এবং ধোয়ার পর এর আয়তন বা বহরে কোনো পরিবর্তন হয় না।

বুননের কৌশলের দিক থেকে টাঙ্গাইলের শাড়ি তিন ধরনের তাঁতে তৈরি হয়— হাতে চালিত গর্ত তাঁত (পিটলুম), আধা স্বয়ংক্রিয় চিত্তরঞ্জন তাঁত এবং বিদ্যুৎ-চালিত পাওয়ার লুম। সুতার ব্যবহারের ক্ষেত্রেও বৈচিত্র্য আনা হয়েছে; সাধারণত ৬০ কাউন্ট, ৮০ কাউন্ট এবং ৮০ বাই ৮০ কাউন্টের সুতা ব্যবহৃত হয়। শুধু সুতি নয়, বর্তমানে মার্সারাইজড সুতি, হাফ সিল্ক, সিল্ক এবং সিনথেটিক কাপড়েও শাড়ি বোনা হচ্ছে। মূল্যসীমার কথা বললে, সাধারণ ৫শ টাকা থেকে শুরু করে উচ্চমানের শাড়ির দাম ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত হতে পারে।

আধুনিক ফ্যাশন হাউসে এখন টাঙ্গাইল শাড়ির নতুন রূপ দেখা যাচ্ছে। টাঙ্গাইল শাড়ি কুটিরের স্বত্বাধিকারী মুনিরা এমদাদ জানান, তারা ঐতিহ্যগত বুননের পাশাপাশি শিবোরি, টাই–ডাই, ব্লক প্রিন্ট এবং এমব্রয়ডারির মতো আধুনিক কাজ যুক্ত করছেন। এমনকি টাঙ্গাইলের বোনা কাপড় দিয়ে এখন স্কার্ফ ও বিভিন্ন আধুনিক পোশাকও তৈরি হচ্ছে। পাড়ের নকশা অনুযায়ী এই শাড়িগুলোকে পাতি পাড়, চুড়ি পাড় বা ঘষা পাড় হিসেবে চিহ্নিত করা হয়।

তবে এই সমৃদ্ধ ঐতিহ্যের সামনে এখন বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে নতুন প্রজন্মের অনীহা। তাঁতের কাজে তরুণদের অংশগ্রহণের অভাব নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন অনেক ব্যবসায়ী। তা সত্ত্বেও ঈদ, পূজা, বিয়ে বা বৈশাখী উৎসবের মতো সব আয়োজনে টাঙ্গাইল শাড়ির আবেদন এখনো অটুট। যথাযথ স্টাইলিং ও আধুনিক ব্লাউজের সমন্বয়ে এই শাড়িগুলো যেকোনো উৎসবে আভিজাত্য ফুটিয়ে তোলে।