রুপসা বিলের জেলে হানিফের জীবন এক নিরন্তর সংগ্রাম আর ছোট ছোট প্রাপ্তির গল্প। সম্প্রতি তিনি দীর্ঘ আড়াই বছর ধরে পালন করা একটি গরু ৬০ হাজার টাকায় বিক্রি করেন। তবে সেই টাকার বড় অংশই চলে যায় ঋণ পরিশোধে; ৪৫ হাজার টাকার ঋণ এবং অন্যান্য খরচ মিটিয়ে তার হাতে থাকে মাত্র ১৫ হাজার টাকা। এই সামান্য অর্থ দিয়ে দুই মাস তার স্ত্রী ও সন্তানদের ভরণপোষণ চলে। যখন ঘরের চালের ড্রাম প্রায় শূন্য হয়ে আসে, তখন তার ছয় বছর বয়সী মেয়ে পুতুলের উদ্বেগ দেখে হানিফ ভেঙে না পড়ে বরং নতুন করে স্বপ্ন বুনতে শুরু করেন। মেয়ের পরিবারের প্রতি এই মমত্ববোধকে তিনি আল্লাহর নিয়ামত হিসেবে দেখেন এবং পুনরায় গরু পালনের সিদ্ধান্ত নেন।

হানিফের মেয়ে পুতুল পড়াশোনায় বেশ আগ্রহী এবং বিশেষ করে গণিতে অত্যন্ত মেধাবী। তবে তার শৈশবে এক দুর্ঘটনা ঘটেছিল; কানের ভেতর ধান ঢুকে যাওয়ার ফলে এক কানে তার শ্রবণশক্তি হ্রাস পায় এবং সহপাঠীরা তাকে 'হাটকালা' বলে উপহাস করত। তবে হানিফ হাল ছাড়েননি, নেত্রকোনার একজন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের সহায়তায় পুতুলের কানে একটি যন্ত্র বসানো হয়, যার ফলে সে এখন আগের চেয়ে ভালো শুনতে পাচ্ছে। মেয়ের এই মেধাকে কাজে লাগিয়ে তাকে উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত করে বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠানোর প্রবল ইচ্ছা পোষণ করেন হানিফ। তিনি মনে করেন, তার নিজের গণিতের প্রতি যে সহজাত দক্ষতা ছিল, তা তার মেয়ের মধ্যেও বিদ্যমান।

সংসারের প্রধান উপজীবিকা হলো রুপসা বিল, যেখানে পৈতৃক সূত্রে পাওয়া পাঁচটি মাছের খৈন রয়েছে হানিফের। তার বাবা মোতালেবের কাছ থেকে শেখা মাছ ধরার কৌশলেই তিনি এখন সংসার চালান। শোল, বোয়াল, রুই, কাতলাসহ বিভিন্ন প্রজাতির মাছ ধরে তিনি পরিবারের মুখে অন্ন জোগান। এছাড়া তার আট কাঠা জমির মধ্যে তিন কাঠার ধানে ছয় মাসের খোরাক চলে। বাকি পাঁচ কাঠা জমি বর্তমানে ভাড়া দেওয়া থাকলেও, আগামী বছরের মধ্যে তা উদ্ধার করে সারা বছরের চালের সংস্থান এবং কিছু বাড়তি আয় করার পরিকল্পনা করছেন তিনি।

দীর্ঘ দুই মাস কর্মবিমুখ থাকার পর পুনরায় বিলে নেমে হানিফের জীবনযাত্রা শুরু হয়। প্রথম দিনে খুব বেশি মাছ না পেলেও ১০০ টাকা আয় করে তিনি চাল এবং সন্তানদের জন্য কিছু মিষ্টি কিনে আনেন। পরবর্তী রাতে বড়শিতে বড় শোল ও পুঁটি মাছ পাওয়ার পর তার মুখে হাসি ফেরে। শেষপর্যন্ত একটি বড় বোয়াল মাছ ৭৫০ টাকায় বিক্রি করে তিনি সাময়িক আর্থিক স্বস্তি পান। দারিদ্র্যের কঠোর বাস্তবতার মাঝেও সন্তানদের প্রতি ভালোবাসা আর পরিশ্রমের মাধ্যমেই হানিফ তার জীবন অতিবাহিত করছেন।