জন্মগত শারীরিক সীমাবদ্ধতাকে পরাজিত করে সফল ক্যারিয়ার গড়ে তুলেছেন কক্সবাজারের চকরিয়া পৌরসভার দক্ষিণ কাহারিয়াঘোনা এলাকার বাসিন্দা নাজমা আকতার। ২৮ বছর বয়সী এই নারী জন্ম থেকেই বাঁ হাতের কনুই পর্যন্ত নেই। শৈশব থেকেই তাঁর এই শারীরিক পার্থক্য নিয়ে আত্মীয়-স্বজন এবং স্থানীয়দের তীব্র সমালোচনা ও কটু কথা শুনতে হয়েছে। অনেকে এমনকি তাঁর মা-বাবাকে বলেছিলেন যে, প্রতিবন্ধী হওয়ার কারণে নাজমা বড় হয়ে অকেজো হয়ে পড়বে এবং সারা জীবন তাঁদের ওপর নির্ভরশীল থাকবে।
তবে সমাজের নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি নাজমাকে দমাতে পারেনি। বরং দৃঢ় সংকল্প নিয়ে পড়াশোনা চালিয়ে যান তিনি। ২০১৩ সালে চকরিয়া কেন্দ্রীয় উচ্চবিদ্যালয় থেকে এসএসসি এবং ২০১৫ সালে চকরিয়া কমার্স কলেজ থেকে এইচএসসি সম্পন্ন করেন। এরপর ২০২০ সালে কক্সবাজার সরকারি কলেজ থেকে ব্যবস্থাপনা বিভাগে স্নাতক এবং ২০২১ সালে চট্টগ্রামের সরকারি হাজী মুহাম্মদ মহসিন কলেজ থেকে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। এই দীর্ঘ শিক্ষাজীবনে আর্থিক সংকটের মুখোমুখি হলেও তিনি হাল ছাড়েননি। উচ্চমাধ্যমিক পর্যায় থেকে টিউশনি করে এবং সরকারি উপবৃত্তি ও প্রতিবন্ধী ভাতার সাহায্যে তিনি তাঁর পড়াশোনার ব্যয়ভার বহন করেন। স্নাতক পড়ার সময় তাঁকে লজিংয়ে থেকে কষ্টসাধ্য জীবনযাপন করতে হয়েছে।
বর্তমানে নাজমা ‘সোশ্যাল অ্যাসিস্ট্যান্ট অ্যান্ড রিহ্যাবিলিটেশন ফর দ্য ফিজিক্যালি ভালনারেবল’ নামক একটি বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থায় হিসাবরক্ষক হিসেবে কর্মরত। তাঁর কাজের দক্ষতা সম্পর্কে প্রতিষ্ঠানটির আঞ্চলিক পরিচালক কাজী মাকসুদুল হক জানান, নাজমা তাঁর এক হাত দিয়েই অফিস এবং যাবতীয় কাজ অত্যন্ত দক্ষতার সাথে সামলান, যা দেখে কেউ বিশ্বাস করতে পারে না যে তিনি একজন বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন ব্যক্তি।
ব্যক্তিগত জীবনেও সুখ খুঁজে পেয়েছেন নাজমা। ২০২৩ সালে মিরাজ উদ্দিনের সাথে তাঁর বিবাহ সম্পন্ন হয়, যার চকরিয়া পৌরসভায় একটি প্রসাধনীর দোকান রয়েছে। বর্তমানে তাঁদের ১৪ মাস বয়সী একটি সন্তান রয়েছে। নাজমা জানান, তাঁর স্বামী এবং শ্বশুর-শাশুড়ির অকুন্ঠ সমর্থন ও অনুপ্রেরণা তাঁকে এই কঠিন পথ পাড়ি দিতে সাহস জুগিয়েছে। নাজমার মতে, একাগ্রতা ও কঠোর পরিশ্রম থাকলে যেকোনো প্রতিবন্ধকতা জয় করে সমাজে নিজের অবস্থান তৈরি করা সম্ভব। আজ তিনি কেবল আর্থিকভাবে স্বাবলম্বীই নন, বরং এক সময়ের সমালোচকদের চোখেও হয়ে উঠেছেন এক অনুপ্রেরণার নাম।




