মানুষের জীবনে সবচেয়ে মূল্যবান বস্তু কোনটি—এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে অনেকেই অর্থ, প্রতিপত্তি বা সামাজিক স্বীকৃতিকে প্রাধান্য দেন। তবে ইসলামের দৃষ্টিতে এসব কিছুর চেয়ে শ্রেষ্ঠ ও অপরিবর্তনীয় সম্পদ হলো জীবন নিজেই এবং জীবনের প্রতিটি ক্ষণ। ধন-সম্পদ পরিশ্রম করে আবার অর্জন করা যায়; অসুস্থ শরীর চিকিৎসার মাধ্যমে সুস্থ করা সম্ভব; কিন্তু একবার অতিবাহিত হয়ে যাওয়া একটি মুহূর্ত আর কোনোভাবেই ফিরিয়ে আনা যায় না। ইসলামি বিশ্বাস অনুযায়ী, এই জীবন আল্লাহর পক্ষ থেকে বান্দাকে দেওয়া এক পবিত্র আমানত—যা নিছক ভোগ-বিলাস বা ইচ্ছামতো চলার সুযোগ নয়, বরং প্রতিটি সেকেন্ডের জন্য পরকালে হিসাব দিতে হবে। তাই জীবনের প্রকৃত মূল্যায়ন মানে দীর্ঘ আয়ু কামনা করা নয়; বরং প্রতিটি নিশ্বাস ও মুহূর্তকে কল্যাণকর কাজে ব্যবহার করাই এর মূল উদ্দেশ্য।

কোরআনের শিক্ষা অনুযায়ী, জীবনের যেকোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণে নিজের খেয়ালখুশি বা সাময়িক আবেগকে প্রাধান্য না দিয়ে আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের নির্দেশকেই সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে। সুরা হুজুরাতের প্রথম দুই আয়াতে এ বিষয়ে স্পষ্ট নির্দেশনা রয়েছে—মুমিনদের আল্লাহ ও রাসুলের সামনে অগ্রণী হতে নিষেধ করা হয়েছে এবং নবীজির কণ্ঠস্বরের ওপর নিজেদের কণ্ঠস্বর উঁচু না করার তাগিদ দেওয়া হয়েছে। এ প্রসঙ্গে দ্বিতীয় খলিফা ওমর ইবনুল খাত্তাব (রা.)-এর জীবন থেকে একটি শিক্ষণীয় ঘটনা উল্লেখযোগ্য। আয়াত নাজিলের পর তিনি নবীজির সামনে এত নিচু স্বরে কথা বলতেন যে, অনেক সময় নবীজিকে তাঁকে পুনরায় জিজ্ঞেস করতে হতো—‘ওমর, তুমি কী বললে?’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৪৮৪৫)। এই ঘটনা থেকে আধুনিক মুসলিমের জন্য শিক্ষা হলো—নিজের চিন্তা, অভ্যাস বা রুচি যেন কখনো নববি শিক্ষার চেয়ে বড় হয়ে না দাঁড়ায়; বরং সুন্নাহর সামনে সম্পূর্ণ বিনম্র সমর্পণই জীবনের সৌন্দর্য।

আধুনিক যুগে সময় নষ্ট হওয়ার সবচেয়ে বড় কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে অনিয়ন্ত্রিত প্রযুক্তি ও সোশ্যাল মিডিয়ার ব্যবহার। প্রযুক্তি নিজে ক্ষতিকর নয়, তবে এর লক্ষ্যহীন ও অতিরিক্ত ব্যবহার মানুষকে অ্যালগরিদমের ফাঁদে ফেলে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপ্রয়োজনীয় কনটেন্টে ডুবিয়ে রাখে। একটি প্রয়োজনীয় তথ্য খুঁজতে গিয়ে মানুষ সহজেই অপ্রয়োজনীয় ভিডিও বা বিতর্কে জড়িয়ে পড়ে, ফলে বহুমূল্য সময়ের পাশাপাশি মানসিক শান্তিও হারায়। রাসুল (সা.) এই সমস্যার একটি চিরন্তন সমাধান দিয়ে গেছেন—‘কোনো ব্যক্তির ইসলামের সৌন্দর্য হলো সে এমন সব বিষয় বর্জন করে যা তার কোনো উপকারে আসে না।’ (সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ২৩১৭)।

নেয়ামত হারানোর আগে তার মূল্য বোঝা অত্যন্ত জরুরি। সুস্থতা, নিরাপত্তা, অবসর—এসব আল্লাহর দেওয়া অমূল্য সম্পদ, কিন্তু অধিকাংশ মানুষই এসবের প্রকৃত গুরুত্ব বোঝে না। রাসুল (সা.) সতর্ক করে বলেছেন, ‘দুটি নেয়ামতের ব্যাপারে অধিকাংশ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত—সুস্থতা ও অবসর।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৬৪১২)। তিনি সর্বদা আল্লাহর কাছে এসব নেয়ামতের স্থায়িত্ব কামনা করে দোয়া করতেন—‘হে আল্লাহ, আমি আপনার নেয়ামত বিলুপ্ত হওয়া, সুস্থতার পরিবর্তন, আকস্মিক আজাব এবং আপনার অসন্তুষ্টি থেকে আশ্রয় চাই।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২৭৩৯)।

জীবনকে সুশৃঙ্খল ও উৎপাদনশীল করতে সময় ব্যবস্থাপনার বিকল্প নেই। একটি সুনির্দিষ্ট দৈনিক পরিকল্পনা না থাকলে কাজ জমতে থাকে এবং জরুরি বিষয়গুলো অবহেলিত হয়। প্রতিদিনের রুটিনে আবশ্যিক কাজগুলো—জামাতে নামাজ, কোরআন পাঠ, পেশাগত দায়িত্ব, পরিবারের প্রতি সময় দেওয়া এবং পর্যাপ্ত বিশ্রাম—সবার আগে স্থান পেতে হবে। এর পাশাপাশি সাপ্তাহিক, মাসিক বা বার্ষিক দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য নির্ধারণ করে সেগুলোর জন্যও সময় বরাদ্দ রাখা দরকার। এছাড়া সব কাজ একা করার প্রবণতা ত্যাগ করে উপযুক্ত ব্যক্তিদের মধ্যে দায়িত্ব ভাগ করে নেওয়াও সময় ব্যবস্থাপনার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক। প্রকৃত নেতৃত্ব হলো সবকিছু নিজের কুক্ষিগত না রেখে সঠিক মানুষকে কাজের দায়িত্ব দেওয়া, যা দলের মধ্যে আস্থা ও দক্ষতা বাড়ায়।

জীবন মূলত সময়েরই সমষ্টি। প্রতিটি দিনের শুরু ও শেষ আমাদের জীবনপুঁজি থেকে একটি দিন চিরতরে কেড়ে নেয়। তাই ভাবা প্রয়োজন—আমরা প্রতিদিন এই মূল্যবান সময় দিয়ে কী রেখে যাচ্ছি? নিছক সাময়িক বিনোদন, অহেতুক তর্ক বা ক্ষণিকের স্মৃতি? নাকি জ্ঞানচর্চা, ইবাদত, সৃষ্টির সেবা ও মানবিক সম্পর্কের এমন একটি স্থায়ী উত্তরাধিকার, যা দুনিয়ায় মানুষের কল্যাণে আসবে এবং আখেরাতে মুক্তির পথ হবে? মানুষের নিশ্বাস একদিন থেমে যাবে, কিন্তু তার রেখে যাওয়া কল্যাণমুখী কর্ম প্রজন্মের পর প্রজন্ম বেঁচে থাকে। সময়ের প্রতিটি কণাকে সঠিক কাজে লাগানোই পরম প্রজ্ঞা, কারণ যে মানুষ সময়ের মূল্য বুঝতে শেখে, সে প্রকৃতপক্ষে নিজের জীবনকেই যথাযথ মূল্যায়ন করতে শেখে।