মানুষের অন্তরের ইমানের আলো তার দৈনন্দিন আচরণ, চিন্তাধারা ও সামগ্রিক জীবনদর্শনের মধ্য দিয়ে প্রকাশ পায়। কেবল মুখের স্বীকৃতির নাম নয় ইমান; বরং এর রয়েছে কিছু দৃশ্যমান আলামত, নৈতিক বৈশিষ্ট্য ও জীবনঘনিষ্ঠ দাবি। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা মুমিনদের সফলতার কথা স্পষ্টভাবে ঘোষণা করেছেন—তারা তাঁদের পালনকর্তার পক্ষ থেকে সুপথপ্রাপ্ত এবং প্রকৃত সফলকাম। (সুরা বাকারা, আয়াত ৫) তাই প্রকৃত মুমিনকে চিনতে হলে শুধু তার কথার দিকে নয়, কর্ম ও চরিত্রের দিকেও দৃষ্টি দিতে হয়।
এই প্রসঙ্গে এক গুরুত্বপূর্ণ হাদিসে মুমিনের বিশটি বৈশিষ্ট্যের বিস্তারিত বর্ণনা এসেছে। সাহাবি সুওয়াইদ ইবনে হারেস (রা.) একবার তাঁর গোত্রের সাতজন সঙ্গীকে নিয়ে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর দরবারে উপস্থিত হন। তাঁদের চেহারা ও পোশাক দেখে নবীজি সন্তুষ্ট হন এবং জানতে চান, তাঁরা কারা। উত্তরে তাঁরা বলেন, ‘আমরা মুমিন।’ এই পরিচয় শুনে নবীজি মুচকি হাসেন এবং জিজ্ঞাসা করেন, তাঁদের কথার এবং তাঁদের ইমানের বাস্তবতা কী?
তাঁরা জানান, তাঁদের মধ্যে পনেরোটি গুণ বিদ্যমান। প্রথম অংশে পাঁচটি বিষয়ে নবীর প্রেরিত দূতেরা তাঁদের ইমান আনতে বলেছেন। এর মধ্যে প্রথম হলো এক আল্লাহর ওপর অবিচল আস্থা—যাঁর সত্তা, ক্ষমতা, জ্ঞান ও কর্তৃত্বের প্রতি বিশ্বাস ইমানের প্রথম ভিত্তি। দ্বিতীয়ত, ফেরেশতাদের ওপর ইমান আনা—আল্লাহর নুরানি সৃষ্টি হিসেবে তাঁদের অস্তিত্ব ও দায়িত্বে বিশ্বাস রাখা। তৃতীয়ত, আল্লাহর কিতাবসমূহের প্রতি আস্থা—যুগে যুগে নাজিল হওয়া আসমানি গ্রন্থগুলোর সত্যতা স্বীকার। চতুর্থত, রাসুলদের ওপর ইমান—অন্ধকার থেকে আলোয় আনার জন্য প্রেরিত নবীদের সত্যতা ও তাঁদের আনীত হিদায়াতকে গ্রহণ। পঞ্চমত, পুনরুত্থানের ওপর বিশ্বাস—মৃত্যুর পর জীবিত হয়ে আল্লাহর সামনে দাঁড়ানো ও প্রতিটি কাজের হিসাবের দিনের ওপর আস্থা রাখা।
পরবর্তী পাঁচটি হলো আমলের নির্দেশনা। প্রথমে ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ পাঠ—এই তাওহিদের ঘোষণার মাধ্যমে সব মিথ্যা উপাস্য ও পরাধীনতা থেকে মুক্ত হয়ে এক আল্লাহর আনুগত্যে নিজেকে সমর্পণ করা। দ্বিতীয়ত, নামাজ কায়েম করা—যা আল্লাহর সঙ্গে মুমিনের সম্পর্ককে জীবন্ত রাখে এবং অন্তরকে পরিশুদ্ধ করে। তৃতীয়ত, জাকাত প্রদান—সম্পদকে পবিত্র করা ও হকদারদের কাছে পৌঁছে দেওয়ার মাধ্যমে সামাজিক দায়বদ্ধতা পালন। চতুর্থত, রমজানের রোজা রাখা—প্রবৃত্তির ওপর নিয়ন্ত্রণ শেখা এবং আত্মসংযম ও তাকওয়ার শিক্ষা অর্জন। পঞ্চমত, সামর্থ্য থাকলে হজ করা—আল্লাহর ঘরের প্রতি আনুগত্য, ত্যাগ ও আত্মসমর্পণের অনন্য শিক্ষা লাভ।
এরপর ইসলামপূর্ব যুগ থেকে অর্জিত আরও পাঁচটি গুণের কথা উল্লেখ করেন তাঁরা। প্রথমত, স্বাচ্ছন্দ্যে আল্লাহর শোকর আদায়—প্রাচুর্যে আত্মভোলা না হয়ে প্রাপ্তিকে অনুগ্রহ হিসেবে দেখা। দ্বিতীয়ত, বিপদের সময় ধৈর্য ধারণ—দুঃখ ও সংকটের মুহূর্তে আল্লাহর ওপর আস্থা অটুট রাখা। তৃতীয়ত, সম্মুখযুদ্ধে অঙ্গীকার রক্ষা—ভয় বা বিপদের মুখেও প্রতিশ্রুতি থেকে সরে না আসা। চতুর্থত, আল্লাহর সব ফয়সালায় সন্তুষ্ট থাকা—তাঁর প্রজ্ঞার ওপর বিশ্বাস রেখে নিজের ইচ্ছা পূরণ না হলেও কোনো বিরোধিতা না করা। পঞ্চমত, বিপদের সময় শত্রুর বিদ্রূপ সহ্য—উত্তেজিত প্রতিক্রিয়া দেখানোর পরিবর্তে নিজেকে সংযত রাখা ও ধৈর্যের পরিচয় দেওয়া।
এই গুণগুলোর প্রশংসা করে নবীজি (সা.) বলেন, ‘তোমরা জ্ঞানী ও প্রজ্ঞাবান। তোমাদের বোধবুদ্ধি প্রায় নবীদের কাছাকাছি।’ এরপর তিনি আরও বলেন, ইমানের দাবিতে যদি তাঁরা সত্যবাদী হন, তবে আরও পাঁচটি গুণ যোগ করে দিচ্ছেন। এভাবে ইমানের বৈশিষ্ট্য বিশে পূর্ণ হলো।
সেই অতিরিক্ত পাঁচটি গুণ হলো—এমন সম্পদ সঞ্চয় না করা যা নিজে ভোগ করা হবে না; কারণ সম্পদ প্রয়োজন মেটানোর উপায়, জীবনের একমাত্র লক্ষ্য নয়। এমন ঘর নির্মাণ না করা যেখানে বসবাসের সুযোগ থাকবে না; কারণ মানুষের জীবন ক্ষণস্থায়ী এবং চূড়ান্ত গন্তব্যকে ভুলে যাওয়া উচিত নয়। এমন বিষয় নিয়ে বিবাদে না জড়ানো যা আগামীকাল ছেড়ে যেতে হবে; কারণ ক্ষণস্থায়ী বিষয়ের জন্য নিজের শান্তি ও সম্পর্ক নষ্ট করা বিচক্ষণতার পরিচয় নয়। সেই আল্লাহকে ভয় করা যাঁর কাছে ফিরে যেতে হবে—এই তাকওয়া গোপন ও প্রকাশ্য উভয় পাপ থেকে দূরে রাখে। এবং সেই চিরস্থায়ী জীবনের প্রতি আকাঙ্ক্ষী হওয়া যেখানে অনন্তকাল অবস্থান করতে হবে—যেখানে মৃত্যু, বিচ্ছেদ ও কোনো অপূর্ণতা নেই। (আবু নুআইম ইস্পাহানি, হিলয়াতুল আউলিয়া ওয়া তবকাতিল আসফিয়া, ৯/২৭৯, দারুল ফিকর, বৈরুত, ১৪১৬ হিজরি)




