মহানবী (সা.)-এর শৈশব ছিল গভীর নিঃসঙ্গতায় ভরা। জন্মের আগেই পিতা হারানো এই শিশুকে মাত্র ছয় বছর বয়সে মাতৃহারা হতে হয়। সিরাত সাহিত্যে মা আমেনার মৃত্যু একটি অত্যন্ত বেদনাদায়ক অধ্যায় হিসেবে বিবৃত। প্রাচীন ভূগোলবিদদের বর্ণনা ও আধুনিক দূরত্ব পরিমাপের মাধ্যমে এই ঘটনার ভৌগোলিক অবস্থান ও সময়কাল স্পষ্টভাবে নিরূপণ করা সম্ভব হয়েছে।

দুধমাতা হালিমা সাদিয়ার কাছে শৈশবের প্রথম পর্ব শেষ করে মক্কায় ফেরার পর মা আমেনা তাঁর ছয় বছরের পুত্রকে নিয়ে ইয়াসরিব তথা মদিনায় যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। এই সফরের পেছনে দুটি পারিবারিক কারণ ছিল। প্রথমত, প্রয়াত স্বামী আবদুল্লাহর কবর জিয়ারত করা এবং দ্বিতীয়ত, প্রপিতামহ হাশিমের সূত্রে মদিনার বনু আদি ইবনে নাজ্জার গোত্রের আত্মীয়দের সঙ্গে শিশু মুহাম্মদের পরিচয় করিয়ে দেওয়া। মা আমেনা, শিশু মুহাম্মদ এবং বিশ্বস্ত পরিচারিকা উম্মে আইমানের ছোট্ট কাফেলাটি তৎকালীন প্রধান বাণিজ্যপথ ধরে মদিনায় পৌঁছে বনু নাজ্জারের পারিবারিক আবাসে প্রায় এক মাস অবস্থান করে।

মদিনায় অবস্থান শেষে মক্কায় ফেরার পথে আবওয়ায় পৌঁছানোর পরপরই মা আমেনা গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন। মক্কা ও মদিনার মধ্যবর্তী এই বিরতিস্থলটি ছিল প্রধান কাফেলা-পথের একটি পরিচিত স্থান। প্রাচীন মুসলিম ভূগোলবিদ ইয়াকুত আল-হামাবির বর্ণনা অনুযায়ী, আবওয়া মদিনা থেকে পাঁচ 'মারহালাহ' দূরত্বে অবস্থিত একটি ঐতিহাসিক জনপদ। আধুনিক দূরত্ব পরিমাপে রাবিগ থেকে মদিনার সড়কপথের দূরত্ব প্রায় ১৯৪ থেকে ২৭৫ কিলোমিটারের মধ্যে। মদিনা থেকে আবওয়ার দূরত্ব মোটামুটি ২০০ থেকে ২২০ কিলোমিটার বলে ধারণা করা হয়। জিপিএস স্থানাঙ্কে এর অবস্থান প্রায় ২৩.০২° উত্তর অক্ষাংশ ও ৩৯.১০° পূর্ব দ্রাঘিমাংশের মধ্যে। তৎকালীন কাফেলার স্বাভাবিক গতিবেগ ছিল ঘণ্টায় ৪.৫ থেকে ৫ কিলোমিটার এবং দৈনিক প্রায় ৪৪.৫ কিলোমিটার পথ অতিক্রমের নিয়মে মদিনা থেকে আবওয়া পৌঁছতে চার থেকে পাঁচ দিন সময় লাগত।

নির্জন উপত্যকায় অসুস্থ মা আমেনার শারীরিক অবস্থার দ্রুত অবনতি ঘটে এবং সেখানেই তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। পরিচারিকা উম্মে আইমান ও স্থানীয়দের সহায়তায় আবওয়ার পাহাড়ের ঢালে তাঁকে সমাহিত করা হয়। পিতার পর সম্পূর্ণ মাতৃহীন হয়ে পড়া ছয় বছরের নিঃসঙ্গ শিশুকে নিয়ে উম্মে আইমান একাই বাকি প্রায় ২০০ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে মক্কায় ফেরেন এবং শিশুটিকে তাঁর দাদা, কোরাইশ প্রধান আবদুল মুত্তালিবের হাতে তুলে দেন।

শৈশবের এই মর্মান্তিক স্মৃতি নবীজির হৃদয়ে চিরকাল অমলিন ছিল। পরবর্তীকালে হোদাইবিয়ার সন্ধি ও মক্কা বিজয়ের অভিযানে যখনই তিনি আবওয়ার পাশ দিয়ে গেছেন, তখনই মায়ের কবরের কাছে গিয়ে দাঁড়িয়েছেন। একবার মায়ের কবর জিয়ারত করতে গিয়ে তিনি কেঁদে ফেলেন, তাঁর কান্না দেখে সাহাবিরাও কেঁদে ওঠেন। মহানবী (সা.) জানান, তিনি আল্লাহর কাছে মায়ের জন্য ক্ষমা প্রার্থনার অনুমতি চেয়েছিলেন, যা মঞ্জুর হয়নি; তবে পরবর্তীতে মায়ের কবর জিয়ারতের অনুমতি দেওয়া হয়।

সিরাতের ধারাবাহিক সময়রেখা অনুযায়ী, নবীজির জন্মসাল ৫৭১ খ্রিষ্টাব্দ এবং মায়ের মৃত্যুর সময় তাঁর বয়স ছিল ছয় পূর্ণ চন্দ্রবছর। হিসাব অনুযায়ী, এই ঘটনা ৫৭৭ খ্রিষ্টাব্দের প্রথমার্ধে, মোটামুটি ফেব্রুয়ারির কাছাকাছি সময়ে ঘটে বলে অনুমান করা হয়। আবওয়া উপত্যকায় আজও বেশ কিছু প্রাচীন নিদর্শন বিদ্যমান, যেমন—মসজিদ আল-কুরাইন, মসজিদ আল-জুমা, সুক কাবায়েল এবং বিরে কুরাশিয়া। এলাকাটিতে আব্বাসীয় হজের পথে ব্যবহৃত পাথরের মাইলফলকের অবশিষ্টাংশ, লিহিয়ানীয় শিলালিপি ও প্রাচীন ইসলামি লিপি ছড়িয়ে রয়েছে, যা এই উপত্যকায় সুপ্রাচীন মানববসতি ও আরব উপদ্বীপের বাণিজ্যিক পথের সঙ্গে এর প্রাথমিক যোগাযোগের প্রমাণ দেয়।