প্রশংসা মানুষের মনে আনন্দ তৈরি করে, কিন্তু ইসলামের দৃষ্টিতে এটি একটি সূক্ষ্ম পরীক্ষাও বটে। অন্য কেউ আমাদের কাজের স্বীকৃতি দিলে আত্মবিশ্বাস বাড়ে ঠিকই, তবে বারবার প্রশংসার মুখোমুখি হলে অজান্তেই অন্তরে অহংকার বাসা বাঁধতে পারে। কুরআনে স্পষ্ট বলা হয়েছে, ‘তোমরা নিজেদের পবিত্র দাবি করো না। কে মুত্তাকি, তিনি তা ভালোভাবে জানেন’ (সুরা নাজম, আয়াত: ৩২)। এ প্রেক্ষিতে প্রশংসা পাওয়ার সময় একজন মুমিনের করণীয় নিয়ে আলোচনা করা হলো।
সর্বপ্রথম করণীয় হলো আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করা। যে গুণের কারণে প্রশংসা করা হচ্ছে, তার প্রকৃত উৎস আল্লাহ। সুরা নাহলের ৫৩ নম্বর আয়াতে ঘোষণা করা হয়েছে, ‘তোমাদের কাছে যে নেয়ামত আছে, তা আল্লাহর পক্ষ থেকে।’ তাই প্রশংসা শুনে অন্তরে ‘আলহামদুলিল্লাহ’ বলা উচিত—স্বীকার করে নেওয়া যে মানুষের ভালো বলার পেছনে আল্লাহরই দান রয়েছে। এক্ষেত্রে নবী করিম (সা.)-এর হাদিসও প্রণিধানযোগ্য, যেখানে তিনি এক ব্যক্তিকে অপর ব্যক্তির অতিরঞ্জিত প্রশংসা করতে দেখে বলেছিলেন, ‘তোমরা তোমাদের ভাইয়ের ঘাড় কেটে দিয়েছ।’
দ্বিতীয়ত, প্রশংসাকে নিজের জন্য পরীক্ষা হিসেবে গ্রহণ করা। নিন্দা মানুষকে ভুল সংশোধনে উদ্বুদ্ধ করে, কিন্তু প্রশংসা মানুষকে নিজের ভুলের প্রতি অন্ধ করে দিতে পারে। তাই কারো প্রশংসা শুনলে মুমিনের নিজেকে প্রশ্ন করা উচিত—‘আমি কি সত্যিই এমন, নাকি মানুষ আমার একটি ভালো দিক দেখেই এরকম মন্তব্য করছে?’ এই আত্মসমালোচনা অন্তরকে বিনয়ী রাখে এবং ধ্বংসের পথ থেকে রক্ষা করে।
তৃতীয় করণীয় হলো লোকদেখানো থেকে নিজেকে বাঁচানো। প্রশংসার প্রতি আসক্তি তৈরি হলে কাজের নিয়ত নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা থাকে। মানুষ যখন প্রশংসা বন্ধ করে দেয়, তখন ভালো কাজেও অনীহা আসতে পারে। অথচ সহিহ বুখারির হাদিসে বলা হয়েছে, ‘নিশ্চয়ই কাজ নিয়তের ওপর নির্ভরশীল।’ তাই মানুষের প্রশংসার চেয়ে আল্লাহর কবুলিয়াতই মুখ্য—এটাই মুমিনের মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত।
চতুর্থত, অতিরিক্ত প্রশংসা থেকে সতর্ক থাকা জরুরি। রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘তোমরা তোমাদের ভাইয়ের ঘাড় কেটে দিয়েছ’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৬০৬০)। অতিরঞ্জিত প্রশংসা মানুষের মাঝে আত্মতুষ্টি এবং অহংকার সৃষ্টি করতে পারে। তাই প্রশংসা করার সময়ও সত্যের সীমা অতিক্রম না করার নির্দেশনা রয়েছে ইসলামে।
সর্বশেষ করণীয় হলো প্রশংসার মাঝে নিজের বাস্তব অবস্থানকে মনে রাখা। মানুষ শুধুমাত্র বাহ্যিক দিক দেখে মূল্যায়ন করে; আমাদের জীবনের অনেক গোপন দিক রয়েছে, যা অন্যের অজানা। কিন্তু আল্লাহ আমাদের প্রকাশ্য ও গোপন সব বিষয়ই জানেন। তাই প্রশংসা শুনে নিজের অপূর্ণতাগুলো স্মরণ করা উচিত। হজরত আবু বকর (রা.)-এর দোয়াটি এ প্রসঙ্গে চমৎকার দৃষ্টান্ত—তিনি বলতেন, “আল্লাহুম্মা আনতা আ‘লামু বিঈ মিনহুম, ওয়া আনা আ‘লামু বিনাফসি মিনহুম...।” অর্থাৎ ‘হে আল্লাহ, আপনি আমার সম্পর্কে তাদের চেয়ে বেশি জানেন। আর আমি নিজের সম্পর্কে তাদের চেয়ে বেশি জানি। তারা আমাকে যেমন মনে করে, আমাকে তার চেয়েও উত্তম করুন এবং তাদের অজানা বিষয়গুলো ক্ষমা করুন।’
প্রশংসা আল্লাহর অনুগ্রহ হলেও এটি যেন অহংকারের কারণ না হয়, বরং আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের প্রেরণা হয়ে ওঠে—সেটিই মুমিনের কাম্য। মানুষের মুখের প্রশংসা ক্ষণস্থায়ী, কিন্তু আল্লাহর সন্তুষ্টিই চিরস্থায়ী।




