দেশের যানবাহন বাজারে এখন স্পষ্ট এক রূপান্তর দেখা যাচ্ছে। জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি, পরিবেশ সম্পর্কে ক্রমবর্ধমান সচেতনতা এবং দীর্ঘমেয়াদে পরিচালন ব্যয় কমানোর চিন্তা থেকে ক্রেতারা ধীরে ধীরে পেট্রল বা ডিজেলের বদলে হাইব্রিড ও বৈদ্যুতিক গাড়ির (ইভি) দিকে মন দিচ্ছেন। এই পরিবর্তনের পেছনে সরকারের নীতিমালা এবং বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর উদার অর্থায়ন সুবিধা বড় ভূমিকা রাখছে। বাজারে জাপানি রিকন্ডিশন্ড গাড়ির দাম ১৫ থেকে ৪০ লাখ টাকার মধ্যে থাকলেও হাইব্রিড মডেলের দাম ৩৫ থেকে ৭০ লাখ এবং নতুন ইভির দাম ৪৫ লাখ থেকে ১ কোটি টাকা পর্যন্ত। বিলাসবহুল গাড়ির দাম তো কয়েক কোটি টাকায় পৌঁছেছে। দামের তারতম্য থাকলেও জ্বালানি সাশ্রয়, কম রক্ষণাবেক্ষণ খরচ এবং ব্যাংকগুলোর আকর্ষণীয় অর্থায়নের কারণে হাইব্রিড ও ইভি এখন মধ্যবিত্ত এবং করপোরেট পেশাজীবীদের মধ্যে দারুণ জনপ্রিয় হয়ে উঠছে।
পরিবেশবান্ধব গাড়িতে ব্যাংকগুলোর ঋণ প্রদানের আগ্রহ কেন বেশি? মূল কারণটি হলো বাংলাদেশ ব্যাংকের মে মাসে প্রকাশিত নতুন অটো লোন গাইডলাইন। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলা এবং গ্রিন মোবিলিটি উৎসাহিত করতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক প্রচলিত তেলচালিত গাড়ির ক্ষেত্রে ঋণের সর্বোচ্চ সীমা ৬০ লাখ টাকা এবং ঋণ-ইকুইটি অনুপাত ৬০:৪০ বহাল রেখেছে। অন্যদিকে, ইভি, হাইব্রিড এবং দেশে উৎপাদিত বা সংযোজিত গাড়ির জন্য ঋণের সীমা বাড়িয়ে ৮০ লাখ টাকা এবং অনুপাত ৮০:২০ নির্ধারণ করা হয়েছে। এর মানে হলো, একজন গ্রাহক প্রথাগত গাড়ি কিনতে চাইলে তাকে ৪০ শতাংশ ডাউন পেমেন্ট করতে হবে, কিন্তু একই দামের হাইব্রিড বা ইভি কিনতে মাত্র ২০ শতাংশ দিলেই সর্বোচ্চ ঋণ পাওয়া যাচ্ছে। উচ্চ প্রাথমিক বিনিয়োগের বাধা কাটাতেই এই বিশেষ সুবিধা, যা গ্রাহকের তাৎক্ষণিক আর্থিক চাপ অনেকটাই লাঘব করে।
সরকারও পাশে দাঁড়িয়েছে। ‘ইলেকট্রিক ভেহিকেল রেজিস্ট্রেশন অ্যান্ড অপারেশন গাইডলাইন’ বাস্তবায়নের পাশাপাশি বাজেটে বিশেষ নীতিগত সহায়তা দেওয়া হয়েছে। প্রথাগত গাড়িতে শুল্ক ও করের হার ৮৯ থেকে ১২৭ শতাংশ পর্যন্ত থাকলেও দেশে সংযোজিত বা পরিবেশবান্ধব যানবাহনের ক্ষেত্রে তা প্রায় ৩৩ শতাংশে নামিয়ে আনা হয়েছে। এ ছাড়া ইভি ব্যাটারি ও স্থানীয় কারখানায় উৎপাদনের ওপর ভ্যাট ছাড় ২০৩০ সাল পর্যন্ত বহাল রাখা হয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্দেশনার সঙ্গে মিল রেখে দেশের শীর্ষ ব্যাংকগুলো এখন সাশ্রয়ী সুদ এবং নমনীয় শর্তে কার লোন বিতরণে প্রতিযোগিতা করছে।
ডাচ্-বাংলা ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও সিইও মো. এহতেশামুল হক খান জানান, তাদের অটো লোনে দীর্ঘমেয়াদি কিস্তি ও জিরো হিডেন চার্জ নীতি চাকরিজীবী ও ব্যবসায়ীদের ক্যাশ ফ্লো ঠিক রেখে গাড়ি কেনার সুযোগ দিচ্ছে। ২৪৩টি শাখা, ৩৫০টি উপশাখা এবং ৫ হাজার ৬২০টি এজেন্ট আউটলেটের নেটওয়ার্কের মাধ্যমে ঢাকার বাইরেও এই সেবা পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে। ট্রাস্ট ব্যাংকের এমডি ও সিইও আহসান জামান চৌধুরী বলেন, গ্রিন ব্যাংকিংয়ের আওতায় ইভি ও হাইব্রিড গাড়িতে প্রথাগত গাড়ির চেয়ে ১ শতাংশ কম সুদ নেওয়া হচ্ছে। নতুন গাড়ির ক্ষেত্রে ৬ বছর এবং রিকন্ডিশন্ডের জন্য ৫ বছরের মেয়াদ রাখা হয়েছে। তাদের লক্ষ্য শুধু ঋণ বিতরণ নয়, একটি সমন্বিত গ্রিন মোবিলিটি ইকোসিস্টেম গড়ে তোলা।
প্রাইম ব্যাংকের সিইও ফয়সাল রহমান জানান, তাদের “নীরা” উইমেন ব্যাংকিং প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে নারী গ্রাহকদের ইভি ও টু-হুইলার অর্থায়নে সাশ্রয়ী ফি দেওয়া হচ্ছে। নিজস্ব পে-রোল গ্রাহকদের প্রসেসিং ফি সম্পূর্ণ মওকুফসহ দ্রুততম সময়ে লোন ছাড় করা হচ্ছে। ব্র্যাক ব্যাংক পিএলসির ডেপুটি ম্যানেজিং ডিরেক্টর মো. মাহীয়ুল ইসলাম বলেন, ৮০:২০ অনুপাতের কারণে মাত্র ২০ শতাংশ ডাউন পেমেন্টে লোন পাওয়া যাচ্ছে। ১২ থেকে ৭২ মাসের ইএমআই সুবিধা এবং “আস্থা” অ্যাপের মাধ্যমে ডোরস্টেপ ব্যাংকিং গ্রাহকদের পরিবেশবান্ধব গাড়ি নিতে উদ্বুদ্ধ করছে। সিটি ব্যাংকের হেড অব প্রোডাক্টস সুবীর কুমার কুণ্ডু জানান, তাদের ১ হাজার ৫০০ কোটি টাকার অটো লোন পোর্টফোলিওতে বিগত দেড় বছরের ৭০ শতাংশ ঋণই গেছে সাড়ে তিন হাজার ইভি ও হাইব্রিড গাড়ির পেছনে। নয় শতাধিক ডিলার পার্টনারশিপ এবং দ্রুত লোন প্রসেসিংয়ের মাধ্যমে তারা সবুজ অর্থায়নে কাজ করছে।
ব্যাংক কর্তাদের এই মতামত এবং নীতিগত বাজার বিশ্লেষণ ইঙ্গিত দেয় যে আধুনিক প্রযুক্তি, সরকারের শুল্কসুবিধা এবং ব্যাংকগুলোর সহজ অর্থায়ন কাঠামোর যৌথ প্রভাবে বাংলাদেশে হাইব্রিড ও ইভির বাজার আরও গতিশীল হবে। এই সমন্বিত উদ্যোগ শুধু ব্যক্তিগত যাতায়াতকে সহজ করছে না, বরং আগামী প্রজন্মের জন্য একটি পরিচ্ছন্ন, স্মার্ট ও সবুজ বাংলাদেশ নির্মাণের পথ প্রশস্ত করছে।




