দেশের ব্যাংকিং খাতে গাড়ি ঋণের ক্ষেত্রে নতুন গতি লক্ষ্য করা যাচ্ছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নীতিমালা শিথিল করার পর সুদহার উল্লেখযোগ্য হারে কমেছে, যা এখন ৮ দশমিক ৯৯ থেকে ১০ শতাংশের মধ্যে সীমাবদ্ধ। পাশাপাশি বৈদ্যুতিক ও হাইব্রিড গাড়ি কেনার জন্য একজন গ্রাহককে সর্বোচ্চ ৮০ লাখ টাকা পর্যন্ত ঋণ প্রদান করা হচ্ছে। ফলে ব্যাংকগুলোর বিতরণ করা গাড়ি ঋণের প্রায় অর্ধেকই এখন পরিবেশবান্ধব যানবাহনের জন্য। দীর্ঘদিন পর দেশের গাড়ির বাজারে এই খাতে ঋণ সরবরাহ বৃদ্ধিতে কিছুটা প্রাণচাঞ্চল্য ফিরে এসেছে।
গাড়ি কেনার ক্ষেত্রে ব্যাংকঋণকে সবচেয়ে নিরাপদ ও নির্ভরযোগ্য পদ্ধতি হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এই ঋণ গ্রহণের সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো, গ্রাহককে কোনো ব্যক্তিগত সম্পত্তি বন্ধক রাখতে হয় না। ঋণের মাধ্যমে কেনা গাড়ির মালিকানা ব্যাংক ও ঋণগ্রহীতার যৌথভাবে থাকে এবং সম্পূর্ণ ঋণ পরিশোধের পরই গ্রাহক পূর্ণ মালিকানা লাভ করেন। বন্ধক না থাকায় ঋণ অনুমোদনের সময় ব্যাংক গ্রাহকের বর্তমান আর্থিক সক্ষমতা যাচাই করে। চাকরিজীবীদের ক্ষেত্রে চাকরির স্থায়িত্ব ও বেতন, আর ব্যবসায়ীদের ক্ষেত্রে ব্যবসায়িক অবস্থা মূল্যায়ন করা হয়। আবেদনের সময় টিআইএন, ট্রেড লাইসেন্স বা চাকরির সনদসহ প্রয়োজনীয় নথি জমা দিতে হয়। ২৫ থেকে ৬৫ বছর বয়সী যেকোনো নাগরিক এই ঋণের জন্য আবেদন করতে পারেন এবং চাকরিজীবীদের ন্যূনতম মাসিক আয় ২৫ থেকে ৫০ হাজার টাকা হতে হবে।
বাংলাদেশ ব্যাংক গত মে মাসে এক প্রজ্ঞাপনে ইলেকট্রিক ও হাইব্রিড যানবাহন কেনার জন্য ব্যাংকগুলোকে একজন গ্রাহককে ৮০ লাখ টাকা পর্যন্ত অটো লোন দেওয়ার অনুমতি দেয়। অন্যান্য গাড়ির ক্ষেত্রে ঋণসীমা সর্বোচ্চ ৬০ লাখ টাকা, যা বিমাসহ নির্ধারিত। এক্ষেত্রে অর্থায়ন সুবিধা সর্বোচ্চ ৬০:৪০ ঋণ-ইকুইটি অনুপাতে দিতে হবে, তবে হাইব্রিড বা ইলেকট্রিক গাড়ির জন্য এই অনুপাত ৮০:২০ পর্যন্ত নির্ধারিত। অর্থাৎ এক কোটি টাকার একটি সাধারণ গাড়ির জন্য ব্যাংক ৬০ লাখ টাকা ঋণ দেবে, বাকি ৪০ লাখ টাকা গ্রাহককে দিতে হবে। অপরদিকে একই দামের হাইব্রিড বা ইলেকট্রিক গাড়ির ক্ষেত্রে ব্যাংক ৮০ লাখ টাকা ঋণ দিতে পারবে, গ্রাহককে শোধ করতে হবে মাত্র ২০ লাখ টাকা।
এই নীতিমালার পর গাড়ি ঋণে নতুন চাহিদা তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর অনেকেই নতুন গাড়ি কেনায় আগ্রহী হয়েছেন, যার মধ্যে বিলাসবহুল গাড়িও অন্তর্ভুক্ত। দেশের গাড়ি ঋণের বাজারে শীর্ষে রয়েছে বেসরকারি খাতের সিটি ব্যাংক। প্রতি মাসে ৩০০ থেকে ৩৫০টি গাড়ি কেনার জন্য ঋণ দিচ্ছে ব্যাংকটি, যার পরিমাণ প্রায় ১২০ কোটি টাকা। সম্প্রতি সিটি ব্যাংক গাড়ি ঋণের সুদহার ১০ শতাংশে নামিয়ে এনেছে। সিটি ব্যাংকের উপব্যবস্থাপনা পরিচালক অরূপ হায়দার জানিয়েছেন, তাদের গাড়ি ঋণে ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হয়েছে এবং হাইব্রিড ও বৈদ্যুতিক গাড়ির ঋণ বিতরণ দ্বিগুণ হয়ে গেছে। বর্তমানে গাড়ি ঋণের অর্ধেকই এই খাতে যাচ্ছে। তিনি আরও উল্লেখ করেন, সাধারণত ব্যবসায়ীরা গাড়ি কেনার জন্য সবচেয়ে বেশি ঋণ নিচ্ছেন, এরপর চাকরিজীবী, চিকিৎসক, প্রকৌশলী ও হিসাববিদেরা।
সিটি ব্যাংকের পরই অবস্থান করছে ব্র্যাক ব্যাংক, যা প্রতি মাসে গাড়ি কিনতে ৫০ থেকে ৬০ কোটি টাকা ঋণ দিচ্ছে। তাদের ঋণের সিংহভাগই ইলেকট্রিক ও হাইব্রিড গাড়ির জন্য। ব্র্যাক ব্যাংকের উপব্যবস্থাপনা পরিচালক ও রিটেইল ব্যাংকিং প্রধান মো. মাহীয়ুল ইসলাম জানান, গাড়ি ঋণের চাহিদা কিছুটা বেড়েছে এবং হাইব্রিড গাড়ি কেনার জন্য এখন আবেদন জমা পড়ছে। গ্রাহকরা গড়ে ৩০ থেকে ৪০ লাখ টাকা পর্যন্ত ঋণ নিচ্ছেন, যদিও ব্যাংক সর্বোচ্চ ৮০ লাখ টাকা দিতে পারে। এছাড়া মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংক প্রতি মাসে ১৩ কোটি টাকা ঋণ দিচ্ছে, যার মাধ্যমে ৪৫টি গাড়ি কেনা হচ্ছে এবং এর মধ্যে ৬১ শতাংশই হাইব্রিড ও ইলেকট্রিক।
সুদহারের ক্ষেত্রে প্রাইম ব্যাংক ও আইএফআইসি ব্যাংক ৮ দশমিক ৯৯ শতাংশ সুদে গাড়ি ঋণ দিচ্ছে। আইএফআইসি ব্যাংকের উপব্যবস্থাপনা পরিচালক শেখ আকতার উদ্দীন আহমেদ বলেন, তারা নতুন করে এই ঋণ প্রদান শুরু করেছেন এবং ঝুঁকি কম থাকায় নীতিমালা শিথিল হওয়ায় ঋণসীমা বেড়েছে। ফলে সুদের হার কমিয়ে গ্রাহক আকৃষ্ট করার চেষ্টা চলছে। অন্যদিকে ব্যাংক এশিয়া অন্য ব্যাংকে থাকা গাড়ি ঋণ ৯ শতাংশ সুদে কিনে নিচ্ছে এবং নতুন ঋণে ৯ দশমিক ৯৯ শতাংশ সুদহার নির্ধারণ করেছে, যার মাধ্যমে বাজারে বড় আকারে প্রবেশের পরিকল্পনা করছে। ইউসিবি, ডাচ্-বাংলা ব্যাংক, ট্রাস্ট ব্যাংক ও ইস্টার্ন ব্যাংকসহ আরও কয়েকটি ব্যাংক এই খাতে ঋণ বাড়াচ্ছে। আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে আইডিএলসি, আইপিডিসি ও লংকাবাংলা ভালো করছে বলে জানা গেছে।




