জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে তীব্র তাপপ্রবাহ এবং নগরায়ণের প্রভাবে বাংলাদেশের কোমল পানীয়র বাজারে ব্যাপক পরিবর্তন এসেছে। এক সময়ের পারিবারিক অনুষ্ঠান বা অতিথি আপ্যায়নের সীমাবদ্ধতা ভেঙে এখন বন্ধুদের আড্ডা, অফিসের বিরতি কিংবা বিভিন্ন কর্পোরেট অনুষ্ঠানে জুস, এনার্জি ড্রিংক এবং কোমল পানীয়র ব্যবহার একটি স্বাভাবিক অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। এই চাহিদার ওপর ভর করে দেশের এই খাতের বাজার ইতিমধ্যে ১০ হাজার কোটি টাকার মাইলফলক অতিক্রম করেছে। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এবং তরুণ প্রজন্মের পরিবর্তিত রুচির কারণে আগামী পাঁচ বছরে এই খাতের বার্ষিক প্রবৃদ্ধি ১২ শতাংশ ছাড়িয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে।

তবে এই বিশাল সম্ভাবনার পাশাপাশি খাতটি বেশ কিছু কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা, বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময় হারের তারতম্য এবং জ্বালানি সংকটের কারণে কাঁচামালের দাম ও পরিবহন খরচ বৃদ্ধি পেয়েছে। বিশেষ করে কনসেন্ট্রেট, নির্দিষ্ট কিছু খাদ্য উপাদান এবং প্যাকেজিং সামগ্রীর জন্য আমদানির ওপর নির্ভরশীলতা এই সংকটকে আরও ঘনীভূত করেছে। অভ্যন্তরীণ বাজারেও চিনি, পিইটি বোতল, ক্যাপ, কার্টন এবং বিদ্যুৎ-গ্যাস ও শ্রমের খরচ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। উৎপাদন ব্যয় বাড়লেও সাধারণ ক্রেতাদের ক্রয়ক্ষমতার কথা বিবেচনা করে পণ্যের দাম বাড়ানো সম্ভব হচ্ছে না, ফলে প্রবৃদ্ধির হার বর্তমানে এক অঙ্কের ঘরে নেমে এসেছে।

এই প্রতিকূল পরিস্থিতিতে টিকে থাকতে কোম্পানিগুলো ছোট ও সাশ্রয়ী মূল্যের প্যাকেজ বাজারজাত করছে। পাশাপাশি উৎপাদন ও সরবরাহ ব্যবস্থায় দক্ষতা বাড়িয়ে ব্যয় নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা চলছে। মেঘনা গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজের (এমজিআই) চিফ মার্কেটিং অফিসার কাজী মো. মহিউদ্দিন জানান, বাংলাদেশের বিশাল জনগোষ্ঠী এবং তরুণ ভোক্তাশ্রেণি এই খাতের দীর্ঘমেয়াদি শক্তির মূল ভিত্তি। তিনি মনে করেন, স্থানীয় কাঁচামালের ব্যবহার বাড়ানো এবং নতুন প্রজন্মের রুচি অনুযায়ী উদ্ভাবনী স্বাদ ও আকর্ষণীয় প্যাকেজিংয়ের মাধ্যমে বাজারে নিজেদের অবস্থান আরও মজবুত করা সম্ভব।

খাতটি সম্প্রসারণের পথে বড় বাধা হিসেবে দেখা দিয়েছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) অস্থির করনীতি। বারবার করকাঠামো পরিবর্তনের ফলে বিনিয়োগ ও প্রবৃদ্ধি বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।数据显示, ২০২০-২১ অর্থবছরে এই খাত থেকে ১ হাজার ৭২ কোটি টাকা রাজস্ব আদায় হলেও ২০২৩-২৪ অর্থবছরে তা কমে ১ হাজার ৪২৪ কোটি টাকায় নেমেছে। বিশেষ করে টার্নওভার কর ০.৬ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৩ শতাংশ করায় মুনাফা নির্বিশেষে করের চাপ বেড়েছে। এছাড়া সম্পূরক শুল্ক ২৫ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৩০ শতাংশ করায় মোট করভার ৫০ শতাংশ ছাড়িয়ে গেছে, যা ভারত (৪০%), শ্রীলঙ্কা (৩০%), নেপাল (৩৮%) এবং ভুটানের (৩০%) তুলনায় অনেক বেশি। পরে ব্যবসায়ীদের দাবির প্রেক্ষিতে টার্নওভার কর কমিয়ে আড়াই শতাংশ করা হয়।

বাংলাদেশ বেভারেজ ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশনের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে দেশে ১৩০টির বেশি কোম্পানি পানি ও বিভিন্ন পানীয় উৎপাদন করছে, যা প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে প্রায় সাড়ে ৩ লাখ মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ করে দিয়েছে। বাজারে বর্তমানে পেপসিকো ও কোকা-কোলার মতো বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি প্রাণ, ট্রান্সকম বেভারেজেস, আকিজ ভেঞ্চার, মেঘনা ও আব্দুল মোনেমের মতো দেশীয় কোম্পানিগুলো শক্তিশালী অবস্থানে রয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, ঘন ঘন কর পরিবর্তন বন্ধ করে একটি বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করা এবং সরকার ও ব্যবসায়ীদের মধ্যে নিয়মিত সংলাপ স্থাপন করা গেলে এই খাতের টেকসই প্রবৃদ্ধি সম্ভব হবে এবং সরকারের রাজস্ব আয়ও বৃদ্ধি পাবে।