জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সাম্প্রতিক এক সভায় ঢাকার তিনটি গুরুত্বপূর্ণ রুটে মেট্রোরেল নির্মাণের অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। অনুমোদিত রুটগুলো হলো— বিমানবন্দর থেকে কমলাপুর, হেমায়েতপুর থেকে ভাটারা এবং গাবতলী থেকে দাসেরকান্দি। নতুন এই প্রকল্প এবং দুটি পুরনো প্রকল্পের ব্যয় সংশোধনের ফলে মোট বিনিয়োগ দাঁড়িয়েছে আড়াই লাখ কোটি টাকা। এর আওতায় পাতাল ও উড়াল মিলিয়ে মোট ৬৪.৪৪ কিলোমিটার পথ তৈরি হবে। তবে এই বিপুল বিনিয়োগের বিপরীতে ভাড়া নির্ধারণ এবং ঋণের কিস্তি পরিশোধ কীভাবে হবে, তা নিয়ে বড় প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।

মেট্রোরেল আইন ২০১৫ অনুযায়ী, এই গণপরিবহনের মূল লক্ষ্য ছিল সাধারণ মানুষকে স্বল্প ব্যয়ে উন্নত সেবা প্রদান করা। তবে বর্তমান বাস্তবতায় উত্তরা-মতিঝিল রুটে ২০ কিলোমিটার দূরত্বের জন্য সর্বোচ্চ ভাড়া ৯০ টাকা, যা প্রচলিত বাসের ভাড়ার তুলনায় অনেক বেশি। এই পরিস্থিতিতে নতুন প্রকল্পগুলোতে যদি আয় বাড়াতে উচ্চ ভাড়া নির্ধারণ করা হয়, তবে তা সাধারণ মানুষের সাধ্যের বাইরে চলে যাবে। অন্যদিকে, ভাড়া কম রাখলে ঋণ পরিশোধের জন্য সরকারকে বিশাল অঙ্কের ভর্তুকি দিতে হবে, যা সামগ্রিক অর্থনীতির ওপর প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি করবে।

আর্থিক বিশ্লেষণ reveals যে, মেট্রোরেলের আয় দিয়ে ঋণ পরিশোধ করা প্রায় অসম্ভব। গত অর্থবছরে (২০২৪-২৫) উত্তরা-মতিঝিল রুটে টিকিট বিক্রি থেকে আয় হয়েছে প্রায় ৪০০ কোটি টাকা। ২০২২ সাল থেকে সর্বশেষ অর্থবছর পর্যন্ত মোট আয় ৬৬৬ কোটি টাকা, যার বাইরে দোকানভাড়া থেকে বছরে ২০ কোটি টাকার মতো আসে। অথচ রক্ষণাবেক্ষণ ও বিদ্যুৎ বাবদ বছরেই ১০০ কোটি টাকার বেশি খরচ হচ্ছে। জাইকার কাছ থেকে নেওয়া ১৯ হাজার ৭১৮ কোটি টাকার ঋণের কিস্তি পরিশোধ ইতিমধ্যে শুরু হয়েছে, যা আগামী ৩০ বছরে দিতে হবে। এছাড়া নতুন প্রকল্পগুলোর জন্য জাইকা, এডিবি এবং দক্ষিণ কোরিয়া থেকে আরও প্রায় ১.৮৫ লাখ কোটি টাকা ঋণ নেওয়া হচ্ছে।

নির্মাণ ব্যয়ের অস্বাভাবিক বৃদ্ধির পেছনে জাইকার বিশেষ শর্তাবলিকে দায়ী করছেন সংশ্লিষ্টরা। অভিযোগ রয়েছে, সম্ভাব্যতা যাচাই থেকে শুরু করে নকশা এবং দরপত্র প্রস্তুত—সব ক্ষেত্রেই জাপানি প্রতিষ্ঠানগুলোর একচ্ছত্র আধিপত্য থাকে। উদাহরণস্বরূপ, এমআরটি লাইন-১ এর পাতালপথে জাপানের নিজস্ব ‘ওয়ান-পাস জয়েন্ট’ পদ্ধতি বাধ্যতামূলক করা হয়েছে, যা প্রতিযোগিতামূলক দর কষাকষির সুযোগ কমিয়ে দেয়। ফলে প্রতি কিলোমিটারে নির্মাণ ব্যয় অনেক বেড়ে গেছে। ভারতে প্রতি কিলোমিটার মেট্রোরেল নির্মাণে ১৫০ থেকে ৪৫০ কোটি টাকা ব্যয় হলেও বাংলাদেশে তা বহুগুণ বেশি।

বুয়েটের পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক সামছুল হক এই বিনিয়োগকে 'ঝুঁকিপূর্ণ' হিসেবে অভিহিত করেছেন। তার মতে, দেশের বিদ্যমান ঋণের বোঝার মাঝে এই বিপুল অর্থ বিনিয়োগ করা এবং পরবর্তীতে সাধারণ মানুষের কাছ থেকে তা আদায় করা একটি বড় চ্যালেঞ্জ। জাইকা ঋণ দেয় ইয়েনে এবং পণ্য কেনে জাপানি প্রতিষ্ঠান থেকে, কিন্তু পরিশোধ করতে হয় ডলারে, যা মুদ্রার মানের পরিবর্তনের কারণে আরও ব্যয়বহুল হয়ে ওঠে। বর্তমানে বিএনপি সরকার এই ব্যয় কমানোর চেষ্টা করলেও জাইকা দরপত্র ব্যবস্থা উন্মুক্ত করতে রাজি হয়নি। বিশেষজ্ঞ মহলের মতে, মেট্রোরেল ঢাকার জন্য অপরিহার্য হলেও এর আর্থিক মডেল এবং ব্যয় নিয়ন্ত্রণ করা এখন সবচেয়ে জরুরি হয়ে পড়েছে।