শ্যাম্পুর পর চুল কিছুক্ষণের জন্য ঝরঝরে থাকলেও দিন শেষে চুলের গোড়া চিটচিটে হয়ে লেগে যাওয়া অনেকেরই নিত্যদিনের সমস্যা। বাংলাদেশের গরম ও আর্দ্র জলবায়ুতে ঘাম, ধুলাবালু এবং মাথার ত্বকের প্রাকৃতিক তেল চুলের এই অবস্থার জন্য মূলত দায়ী। তবে কেবল আবহাওয়াকে দোষারোপ করলে ভুল হবে। আমাদের দৈনন্দিন কিছু অভ্যাস, অনুপযুক্ত হেয়ার প্রোডাক্টের ব্যবহার এবং মাথার ত্বকের বিভিন্ন সমস্যাও এই চিটচিটে ভাবের জন্য সমানভাবে দায়ী। এমনকি চুল পরিষ্কার রাখার অতিরিক্ত তাগিদও অনেক সময় উল্টো ফল বয়ে আনে।
চুল বারবার তৈলাক্ত ও চিটচিটে হয়ে যাওয়ার পেছনে কাজ করতে পারে এমন ১০টি কারণ নিয়ে আলোচনা করা হলো।
১. অপরিষ্কার চিরুনির ব্যবহার:চুল যতই পরিষ্কার রাখা হোক না কেন, চিরুনি যদি নোংরা থাকে তাহলে সেই প্রচেষ্টা বৃথা যেতে পারে। চিরুনির ফাঁকে জমে থাকা পুরোনো চুলের সঙ্গে তেল, ধুলাবালি, মৃত কোষ ও হেয়ার প্রোডাক্টের অবশিষ্টাংশ জমে থাকে। পরিষ্কার চুলে সেই চিরুনি ব্যবহার করলে জমে থাকা ময়লা ও তেল আবার চুলে ফিরে আসে, ফলে শ্যাম্পুর পরপরই চুল চিটচিটে লাগতে শুরু করে। বিশেষত জেল, সিরাম বা স্টাইলিং প্রোডাক্ট ব্যবহার করলে চিরুনি নিয়মিত পরিষ্কার করার বিষয়ে অতিরিক্ত সতর্কতা প্রয়োজন।
২. রাতে শক্ত করে চুল বাঁধা:জট এড়াতে অনেকেই রাতে ঘুমানোর সময় চুল শক্ত করে পনিটেল বা খোঁপা করে রাখেন। কিন্তু এতে চুলের গোড়ার তেল একটি নির্দিষ্ট অংশে জমে যায়। ফলে সকালে উঠে চুলের গোড়া ভারী ও চিটচিটে অনুভূত হতে পারে। রাতে চুল বাঁধার প্রয়োজন হলে খুব টাইট করে না বাঁধাই উত্তম, চুলকে কিছুটা স্বাভাবিক অবস্থায় রাখতে দিন।
৩. গরম ও আর্দ্র আবহাওয়া:গরমে শরীরের পাশাপাশি মাথার ত্বকেও ঘাম উৎপাদন বেড়ে যায়। বাতাসে আর্দ্রতার পরিমাণ বেশি থাকলে এই ঘাম ও তেল চুলকে দ্রুত ভারী এবং চিটচিটে করে তুলতে পারে। এর সাথে ধুলাবালু যুক্ত হলে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়। তাই বাইরে থেকে ফিরে প্রচণ্ড ঘাম হলে মাথার ত্বক পরিষ্কার রাখার প্রতি বিশেষ নজর দেওয়া জরুরি।
৪. বারবার চুলে হাত দেওয়ার অভ্যাস:চুল ঠিক করা, কপাল থেকে সরানো বা নিছক অভ্যাসবশত আমরা প্রায়ই চুলে হাত দিই। কিন্তু হাত ও আঙুলে তেল ও ময়লা থাকে। বারবার চুলে হাত দেওয়ার কারণে সেই তেল ও ময়লা চুলের গোড়ায় স্থানান্তরিত হয়, যা চুল দ্রুত চিটচিটে করে তোলে। তাই অকারণে চুলে হাত দেওয়ার অভ্যাস কমানো জরুরি।
৫. অতিরিক্ত শাইন সিরাম ব্যবহার:চুলকে মসৃণ ও ঝকঝকে করতে শাইন সিরাম খুবই জনপ্রিয়। তবে সিরামের পরিমাণ বেশি হয়ে গেলে, বিশেষ করে চুলের গোড়ায় লাগালে, তা চুলকে চিটচিটে করে তুলতে পারে। সিরাম বা তেল জাতীয় পণ্য ব্যবহারের সময় চুলের মাঝামাঝি থেকে আগা পর্যন্ত লাগানোই সবচেয়ে কার্যকর। মাথার ত্বকে বা চুলের গোড়ায় অতিরিক্ত পণ্য ব্যবহার করা থেকে বিরত থাকা উচিত।
৬. চুলের ধরনের সাথে মানানসই পণ্য নির্বাচনে ভুল:একজনের চুলে ভালো কাজ করা শ্যাম্পু বা কন্ডিশনার অন্য কারো চুলের জন্যও উপযুক্ত হবে, এমন কোনো নিশ্চয়তা নেই। অতিরিক্ত ভারী, তেল-সমৃদ্ধ বা চুলে জমে থাকে এমন পণ্য ব্যবহারে মাথার ত্বক ও চুল চিটচিটে হয়ে উঠতে পারে। নিজের চুল ও মাথার ত্বকের ধরন বুঝে সঠিক পণ্য বেছে নেওয়া খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কন্ডিশনার সাধারণত চুলের মাঝামাঝি থেকে আগা পর্যন্ত ব্যবহার করা উচিত; মাথার ত্বকে অতিরিক্ত কন্ডিশনার দেওয়ার প্রয়োজন নেই।
৭. ঘন ঘন শ্যাম্পু করা:চুলে চিটচিটে ভাব দেখলেই বারবার শ্যাম্পু করার প্রবণতা তৈরি হয়। কিন্তু অতিরিক্ত শ্যাম্পু চুল ও মাথার ত্বকের প্রাকৃতিক তেল শুষে নেয়, যার ফলে চুল শুষ্ক ও রুক্ষ হয়ে যাওয়ার ঝুঁকি বাড়ে। তবে যাদের মাথার ত্বক স্বাভাবিকভাবেই অনেক বেশি তৈলাক্ত, তাদের তুলনামূলকভাবে ঘন ঘন চুল ধোয়ার প্রয়োজন হতে পারে। দিনে কতবার শ্যাম্পু করা উচিত তা চুলের ধরন, মাথার ত্বকের প্রকৃতি, ঘামের পরিমাণ ও দৈনন্দিন কর্মকাণ্ডের উপর নির্ভর করে।
৮. হরমোনের পরিবর্তন:শরীরে হরমোনের তারতম্যের কারণেও মাথার ত্বকে তেল উৎপাদনের পরিমাণ বদলে যায়। নারীদের মাসিক চক্রের বিভিন্ন সময়ে হরমোনের ওঠানামার কারণে ত্বক ও চুলে পরিবর্তন দেখা দিতে পারে। এছাড়া বয়স, নির্দিষ্ট কিছু ওষুধ, গর্ভাবস্থা বা অন্যান্য শারীরিক অবস্থার সাথেও এই পরিবর্তন যুক্ত হতে পারে। তাই হঠাৎ করেই চুল যদি আগের চেয়ে অনেক বেশি চিটচিটে হয়ে যায়, তাহলে বিষয়টি লক্ষ্য রাখা দরকার।
৯. খুশকি বা মাথার ত্বকের রোগ:চুল চিটচিটে হওয়ার সাথে সাথে খুশকি বা চুলকানি থাকলে সমস্যাটি শুধু পরিচ্ছন্নতার সাথে সম্পর্কিত নাও হতে পারে। মাথার ত্বকে অতিরিক্ত তেল জমলে কিছু ক্ষেত্রে ইস্টের আধিক্য ও প্রদাহের কারণে সেবোরিক ডার্মাটাইটিসের মতো সমস্যা তৈরি হতে পারে, যার ফলে মাথার ত্বক তৈলাক্ত, খসখসে ও চুলকানিযুক্ত হয়। এ ধরনের সমস্যায় শুধু শ্যাম্পু পরিবর্তন না করে চর্মরোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়াই শ্রেয়।
১০. খাদ্যাভ্যাস ও পুষ্টি:চুল ও মাথার ত্বকের সুস্থতা শরীরের সামগ্রিক স্বাস্থ্যের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। সুষম খাবার না খাওয়া বা দীর্ঘদিন ধরে পুষ্টির ঘাটতি থাকলে চুলের স্বাভাবিক অবস্থা বিঘ্নিত হতে পারে। তবে চুল চিটচিটে মানেই যে ভিটামিনের ঘাটতি হয়েছে, এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া ঠিক নয়। প্রয়োজনের অতিরিক্ত ভিটামিন বা সাপ্লিমেন্ট খাওয়াও অনুচিত। বরং নিয়মিত সুষম খাবার, পর্যাপ্ত পানি পান এবং স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস অনুসরণের দিকে নজর দেওয়া ভালো।
তাই চুল চিটচিটে হলে কী করবেন?প্রথমেই শ্যাম্পু বদলে ফেলার প্রয়োজন নেই। নিজের দৈনন্দিন অভ্যাসগুলো পর্যবেক্ষণ করা যেতে পারে। নিয়মিত চিরুনি পরিষ্কার রাখা, অকারণে চুলে হাত দেওয়া কমানো, চুলের গোড়ায় অতিরিক্ত স্টাইলিং পণ্য ব্যবহার না করা এবং বাইরে থেকে ফিরে প্রচণ্ড ঘাম হলে মাথার ত্বক পরিষ্কার রাখা জরুরি। চুলের ধরন অনুযায়ী শ্যাম্পু করার একটি নির্দিষ্ট রুটিন তৈরি করা সবচেয়ে কার্যকরী। এখানে মূল বিষয় হলো, চুল চিটচিটে দেখলেই বারবার শ্যাম্পু করা ঠিক নয়, আবার এই ভয়ে শ্যাম্পু পুরোপুরি বন্ধ করাও অনুচিত। মাথার ত্বক ও চুলের প্রয়োজন অনুযায়ী একটি ভারসাম্য বজায় রাখাটাই আসল সমাধান। তবে চিটচিটে ভাবের সাথে অতিরিক্ত খুশকি, চুলকানি, লালচে ভাব, মাথার ত্বকে ঘা বা অস্বাভাবিক চুল পড়ার মতো উপসর্গ দেখা দিলে, অথবা সাধারণ যত্নেও সমস্যার উন্নতি না হলে অবশ্যই চর্মরোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া উচিত।




