বর্তমান সময়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (AI) উত্থান এবং বাজারের দ্রুত পরিবর্তনের ফলে এক চরম অনিশ্চয়তার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে বিশ্ব। এই পরিস্থিতিতে টিকে থাকতে হলে আমাদের মানবিক গুণাবলিকে আরও বেশি গ্রহণ করতে হবে বলে মত দিয়েছেন প্রখ্যাত লেখক, গবেষক এবং অধ্যাপক ব্রেনে ব্রাউন। ওয়াশিংটন ডিসিতে অনুষ্ঠিত 'ফরচুন মোস্ট পাওয়ারফুল উইমেন সামিট'-এ বক্তৃতাকালে তিনি এই বিষয়ের ওপর আলোকপাত করেন।

ব্রাউন উল্লেখ করেন যে, বর্তমানের রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং কর্মক্ষেত্রে আমূল পরিবর্তনের কারণে মানুষ মানসিকভাবে বিপর্যস্ত। মানুষের মস্তিষ্ক সহজাতভাবেই নিশ্চয়তা খোঁজে, কিন্তু বর্তমানে আমরা উচ্চমাত্রার চাপ, ভয় এবং অনিশ্চয়তার সম্মুখীন হচ্ছি, যার জন্য আমাদের স্নায়বিক ব্যবস্থা প্রস্তুত নয়। তার মতে, আজকের দিনে সফল নেতৃত্বের জন্য প্রয়োজন আত্ম-সচেতনতা, স্নায়বিক চাপের সঠিক ব্যবস্থাপনা এবং সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রক্রিয়াকে কিছুটা ধীর করা, যাতে তা প্রতিষ্ঠানের লক্ষ্য ও মূল্যবোধের সাথে সংগতিপূর্ণ থাকে।

প্রযুক্তি নিয়ে আশাবাদী হয়েও ব্রাউন সতর্ক করে বলেন, মানুষের কিছু গভীর দক্ষতা ও গুণাবলি রয়েছে যা এআই-এর পক্ষে নকল করা সম্ভব নয়। তবে দুঃখজনকভাবে, বর্তমানে মানুষ একে অপরের প্রতি সহনশীলতা হারিয়ে ফেলছে এবং মানবিক আচরণে ব্যর্থ হচ্ছে। তিনি এই ব্যর্থতার পেছনে জেনারেল ইলেকট্রিকের সাবেক চেয়ারম্যান ও সিইও জ্যাক ওয়েলচের নেতৃত্ব দর্শনের প্রভাব থাকার কথা বলেন। ওয়েলচ মনে করতেন, মানুষের আবেগীয় গুণাবলি কর্মক্ষমতার ক্ষেত্রে অন্তরায়। এই দর্শন অনেক বড় বড় কোম্পানি গ্রহণ করেছিল, কিন্তু ব্রাউনের মতে, আজকের জটিল পৃথিবীতে এই কঠোর ও অনমনীয় দৃষ্টিভঙ্গি আর কার্যকর নয়।

জ্যাক ওয়েলচের প্রবর্তিত 'ভাইটালিটি কার্ভ' বা 'র‍্যাঙ্ক অ্যান্ড ইয়াঙ্ক' পদ্ধতি সম্পর্কে আলোচনা করতে গিয়ে ব্রাউন বলেন, যেখানে কর্মীদের তিনটি স্তরে ভাগ করে নিচের ১০ শতাংশকে প্রতি বছর ছাঁটাই করা হতো, সেখানে ভয় ও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়। এই পদ্ধতি সহযোগিতার পরিবেশ নষ্ট করে এবং দীর্ঘমেয়াদী সাফল্যের পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়। ব্রাউনের মতে, ভয় দেখিয়ে দীর্ঘসময় মানুষকে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়; কারণ মানুষ হয় এই ভয়ে সংবেদনহীন হয়ে পড়ে অথবা একে স্বাভাবিক হিসেবে গ্রহণ করে। বিশেষ করে বর্তমান প্রজন্মের তরুণরা নেতৃত্বে স্বচ্ছতা, সততা এবং আবেগীয় বুদ্ধিমত্তাকে (Emotional Intelligence) বেশি গুরুত্ব দেয়, যা ওয়েলচের মডেলে অনুপস্থিত ছিল।

উল্লেখ্য, ব্রেনে ব্রাউন তাঁর দীর্ঘ দুই দশকের গবেষণায় সাহসিক নেতৃত্ব, সহমর্মিতা এবং দুর্বলতাকে স্বীকার করার শক্তির ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। তাঁর লেখা 'ডেয়ারিং গ্রেটলি' এবং 'ডেয়ার টু লিড'-সহ ছয়টি বই নিউইয়র্ক টাইমসের বেস্টসেলার তালিকায় স্থান পেয়েছে। তিনি বর্তমানে ইউনিভার্সিটি অফ হিউস্টন এবং ইউনিভার্সিটি অফ টেক্সাস অ্যাট অস্টিন-এর অধ্যাপক হিসেবে কর্মরত। তাঁর গবেষণার মূল কথা হলো—সৃজনশীলতা, সাহস এবং অর্থপূর্ণ সম্পর্কের জন্য দুর্বলতাকে মেনে নেওয়া এবং অস্বস্তিকর অনুভূতির মোকাবিলা করা অপরিহার্য।