সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বর্তমান যুগে আমরা প্রায়ই দেখি আমাদের ঘনিষ্ঠ বন্ধুদের একটি দল কোথাও ঘুরতে গেছে বা ডিনার করছে, অথচ আমাদের আমন্ত্রণ জানানো হয়নি। ইনস্টাগ্রাম বা ফেসবুকের ছবি দেখে এমন উপলব্ধি হওয়া যে, আমি বহিষ্কৃত হয়েছি, তা একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের মনেও গভীর কষ্টের সৃষ্টি করতে পারে। তবে মুদ্রার উল্টো পিঠও রয়েছে; আয়োজকের জন্য অতিথি তালিকা তৈরি করা এবং কাউকে বাদ দেওয়াটাও সমান যন্ত্রণাদায়ক হতে পারে। কারণ সব আয়োজন বড় পরিসরে করা সম্ভব নয়, অনেক সময় নির্দিষ্ট স্থান বা বাজেটের সীমাবদ্ধতা থাকে।

সমাজবিজ্ঞান এবং মনোবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে দেখলে, বন্ধুত্বের বিভিন্ন স্তর থাকে। 'ডানবারস সোশ্যাল থিওরি' অনুযায়ী, মানুষ তার জীবনে প্রায় ১৫০টি অর্থপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখে। এই সম্পর্কগুলো কয়েকটি বৃত্তে বিভক্ত। একদম ভেতরের বৃত্তে থাকে মাত্র ৫ জন অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ বন্ধু, যাদের যেকোনো প্রয়োজনে ডাকা যায়। এরপর থাকে ১৫ জনের একটি বৃত্ত যাদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ থাকে এবং প্রায় ৫০ জনের একটি বড় বৃত্ত যারা মূলত পার্টি বা আড্ডার সঙ্গী। এই বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখা যায়, বন্ধুদের মাঝে ছোট ছোট গ্রুপ থাকাটা কোনো বিশ্বাসঘাতকতা নয়, বরং বন্ধুত্বেরই একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। বিশেষ কোনো বিষয় নিয়ে আলোচনা বা নির্দিষ্ট কারো সঙ্গে সময় কাটাতে চাইলে ছোট গ্রুপ করাটা যৌক্তিক।

তবে সমস্যা তৈরি হয় যখন এই বাদ পড়ার বিষয়টি অন্যের কাছে সামাজিক একঘরে হওয়ার মতো মনে হয়। ইউনিভার্সিটি অফ বাসেল এবং পারডু ইউনিভার্সিটির গবেষণায় দেখা গেছে, সামাজিকভাবে বর্জন বা এক্সক্লুড হওয়ার অনুভূতি মানুষের নিরাপত্তা ও আপন হওয়ার বোধকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে। বিশেষ করে ১০ জনের গ্রুপের মধ্যে ৯ জনকে ডেকে ১ জনকে বাদ দেওয়াকে ব্যক্তিগত বেইমানি হিসেবে গণ্য করা হয়। এছাড়া ডিজিটাল যুগে ছবির ট্যাগিং বা স্টোরি থেকে যখন কেউ জানতে পারে সে আমন্ত্রিত ছিল না, তখন তা মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। অনেক ক্ষেত্রে ইনভাইটেশন লিস্টকে ক্ষমতার হাতিয়ার হিসেবেও ব্যবহার করা হয়, যা বন্ধুত্বের ফাটল ধরাতে পারে।

এই জটিল পরিস্থিতি সামলাতে এবং শিষ্টাচার বজায় রাখতে কিছু প্রশ্ন নিজেকে করা জরুরি। প্রথমত, কতজনকে বাদ দেওয়া হচ্ছে? যদি নির্দিষ্ট একজন বন্ধুকে বারবার সব আয়োজন থেকে রহস্যজনকভাবে বাদ দেওয়া হয়, তবে সেই বন্ধুত্বের গভীরতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। দ্বিতীয়ত, আয়োজনের ধরন কেমন? ৪ জনের ছোট ডিনারের ক্ষেত্রে ১ জন নতুন সদস্য পুরো পরিবেশ বদলে দিতে পারে, কিন্তু ১৫ জনের আড্ডায় ১ জনের যোগ দেওয়াতে তেমন প্রভাব পড়ে না। তৃতীয়ত, আমন্ত্রণের প্রক্রিয়াটি কীভাবে চলছে? কিছু মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে যোগ দেয়, যা স্বাভাবিক। কিন্তু খুব সুনির্দিষ্টভাবে বাছাই করে ছোট তালিকা তৈরি করা অনেক সময় রিয়েলিটি শো-এর মতো মনে হতে পারে।

যদি কোনো বন্ধু আমন্ত্রণে না থাকার কারণে কষ্ট পায়, তবে সেই অনুভূতিকে অস্বীকার না করে স্বীকার করে নেওয়া শ্রেয়। তাকে বোঝানো যেতে পারে যে, এই নির্দিষ্ট আড্ডায় তাকে না ডাকা মানেই তার প্রতি কোনো রাগ থাকা নয়। মানুষের আবেগ সবসময় যুক্তি দিয়ে চলে না, তাই তার খারাপ লাগাকে গুরুত্ব দেওয়া উচিত। সর্বোপরি, ছোট গ্রুপের আড্ডার আনন্দ বজায় রাখতে এবং অন্য কারো মনে কষ্ট না দিতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সেই আড্ডার ছবি পোস্ট না করাই সবচেয়ে নিরাপদ সমাধান। কারণ সবার সব জায়গায় ডাক পাওয়ার সম্ভাবনা নেই, তবে পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ বজায় রাখাই প্রকৃত বন্ধুত্বের পরিচয়।