ঢাকার ভোজনরসিকদের জন্য এবার পাহাড়ের স্বাদ নিয়ে এসেছে একটি বিশেষ আয়োজন। রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবানের পার্বত্য অঞ্চলের রন্ধনঐতিহ্যকে শহরের টেবিলে তুলে ধরার উদ্যোগ নিয়েছে হলিডে ইন ঢাকা সিটি সেন্টার। ‘তিন পাহাড়ের গল্প পাহাড়ি ফুড ফেস্টিভ্যাল ২০২৬’ নামের এই উৎসব শুরু হয়েছে ১৯ আগস্ট এবং চলবে মাসের শেষ দিন, ৩১ আগস্ট পর্যন্ত। এটি কেবল একটি সাধারণ বুফে নয়; বরং তিনটি পাহাড়ি জেলার স্বতন্ত্র রসনার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার একটি প্রচেষ্টা।

এই আয়োজনের পেছনে রয়েছে গভীর প্রস্তুতি। উৎসব শুরুর আগে হোটেলের নির্বাহী শেফ ও তাঁর দল সরাসরি খাগড়াছড়িতে গিয়ে স্থানীয় উপকরণ, রান্নার কৌশল ও পাহাড়ি খাবারের মৌলিক স্বাদ সম্পর্কে জ্ঞান অর্জন করেছেন। সেখান থেকে সংগ্রহ করা হয়েছে বেশ কিছু বিশেষ উপকরণ, যা খাবারের স্বাদকে আরও কাছাকাছি নিয়ে যেতে সাহায্য করেছে। পাশাপাশি পার্বত্য চট্টগ্রাম থেকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে অতিথি শেফ ভিক্টর চাকমাকে। ঐতিহ্যবাহী পদগুলোর রান্নার ধরন ও স্বাদ আরও নির্ভুলভাবে উপস্থাপনের লক্ষ্যেই তাঁর এই অংশগ্রহণ।

মেনুতে রয়েছে বৈচিত্র্যের সমারোহ। বাঁশের ভেতরে ধীরে ধীরে রান্না করা পদগুলো এই উৎসবের অন্যতম আকর্ষণ। ব্যাম্বু চিকেন, ব্যাম্বো শুট চিকেন এবং ব্যাম্বু চিকেন বিরিয়ানি—এই তিনটি পদে বাঁশের ভেতরের রান্নার ফলে খাবারে আসে হালকা ধোঁয়ার সুবাস। স্থানীয় মুরগি ব্যবহারের কারণে ব্যাম্বু চিকেনের মাংসের স্বাদও হয়ে ওঠে আলাদা। বিরিয়ানির সঙ্গে পাহাড়ি রান্নার ঘ্রাণ মিশে তৈরি হয় এক নতুন অভিজ্ঞতা।

স্যুপ ও নুডলসের বিভাগে রয়েছে মুন্ডি। চালের তৈরি নুডলস, লেবু, শুঁটকি চিংড়ি ও স্থানীয় উপকরণে প্রস্তুত এই স্যুপজাতীয় খাবার পাহাড়ি রন্ধনের পরিচিত একটি পদ। শুঁটকি চিংড়ি গুঁড়া করে ব্যবহারের ফলে ঝোলে আসে গভীর স্বাদ, আর ঝালের মাত্রা নিজের পছন্দমতো ঠিক করে নেওয়ার সুযোগ থাকায় এটি আরও উপভোগ্য হয়ে ওঠে।

লাকসু বিভাগের দুটি পদ—চিকেন লাকসু ও ফিশ লাকসু—এখানে পাওয়া যাচ্ছে। বিভিন্ন ধরনের মরিচ, ধনেপাতা ও পেঁয়াজের পেস্ট দিয়ে তৈরি লাকসু ঝাল ও সুগন্ধিযুক্ত। তবে ঝালের পাশাপাশি স্থানীয় উপকরণের নিজস্ব স্বাদও এখানে স্পষ্টভাবে অনুভূত হয়। তোজা নামে আরেকটি পদ পাহাড়ি রান্নার ভিন্ন দিক তুলে ধরে। বিভিন্ন পাহাড়ি শাক ও সবজি সেদ্ধ করে তৈরি এই খাবারে মসলার ব্যবহার অত্যন্ত সীমিত; ফলে সবজির প্রাকৃতিক স্বাদই প্রধান হয়ে ওঠে। সঙ্গে চিংড়ির পেস্ট ও কাঁচা মরিচের সস থাকার কারণে পছন্দ অনুযায়ী ঝাল যোগ করা সম্ভব।

হেবাং ও পাজনের বিভাগে রয়েছে চিকেন হেবাং, মাটন হেবাং, টক পাতার চিকেন, সসা দিয়ে চিকেন, অল্প মসলায় সুগন্ধি পাতায় তৈরি বিভিন্ন মাছের পদ এবং শুঁটকি দিয়ে প্রস্তুত সবজির পাজন। হেবাংয়ের বিশেষত্ব হলো কম মসলায় মূল উপকরণের স্বাদ ও ঘ্রাণকে প্রাধান্য দেওয়া। পাজনে একসঙ্গে মিশে যায় বিভিন্ন পাহাড়ি শাক ও সবজি, যেখানে শুঁটকির ব্যবহার যোগ করে আলাদা এক মাত্রা।

মিষ্টি ও পানীয়তেও রয়েছে পাহাড়ের ছোঁয়া। শেষ পাতে পরিবেশন করা হচ্ছে বিন্নি চালের পিঠা, পায়েস ও ফিন্নিসহ নানা মিষ্টান্ন। পানীয়ের তালিকায় রয়েছে পাহাড়ি তেঁতুলের শরবত এবং পাহাড়ি লেবু-পুদিনার শরবত। ঝাল ও মসলাদার খাবারের পর এই পানীয়গুলো এনে দেয় সতেজতার অনুভূতি। বিশেষ করে লেবু-পুদিনার শরবতের টক-মিষ্টি স্বাদ পুরো ভোজন অভিজ্ঞতাকে সুন্দরভাবে সম্পন্ন করে।

আয়োজনের পরিবেশও বিশেষভাবে সাজানো হয়েছে। হোটেলের লবি থেকে অল্টিচিউড রেস্তোরাঁ পর্যন্ত মিনিয়েচার পাহাড়, জুমঘর, ঝরনা ও জুমচাষের দৃশ্য দিয়ে তৈরি করা হয়েছে পাহাড়ি আবহ। খাবারের টেবিলে মাটির পানির পাত্র ও হারিকেনের আলো যোগ করেছে ভিন্ন মাত্রা। এই সাজসজ্জা অতিথিকে পাহাড়ের গল্পে নিয়ে যায়, আর খাবারের স্বাদ সেই গল্পকে পূর্ণতা দেয়।

এই উৎসবের জনপ্রতি বুফের মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে ৭ হাজার ৯৯৯ টাকা (নেট)। বুফে উপভোগকারী অতিথিদের জন্য হোটেলের সুইমিংপুলে বিনা মূল্যে প্রবেশের সুবিধাও রাখা হয়েছে। ছবি সরবরাহ করেছে হাল ফ্যাশন।

সব মিলিয়ে ‘তিন পাহাড়ের গল্প’ নিছক একটি ফুড ফেস্টিভ্যালের চেয়ে বেশি কিছু। এটি বাংলাদেশের পার্বত্য অঞ্চলের স্বতন্ত্র রন্ধনঐতিহ্যকে শহুরে মানুষের কাছে পরিচিত করে দেওয়ার একটি উদ্যোগ। পাহাড়ি খাবারের সৌন্দর্য তার জটিলতায় নয়; বরং সতেজ উপকরণ, সহজ রান্না এবং প্রকৃতির কাছাকাছি থাকা স্বাদে। যারা পাহাড়ি রসনার সঙ্গে খুব বেশি পরিচিত নন, তাঁদের জন্য এই উৎসব হতে পারে নতুন স্বাদের চমৎকার সুযোগ।