বর্তমান সময়ে ব্যস্ত জীবন ও শিক্ষার্থীদের কাছে দ্রুততম নাস্তার সমাধান হিসেবে নুডলস অত্যন্ত জনপ্রিয়। তবে এই জনপ্রিয় খাবারের পেছনে রয়েছে প্রায় চার হাজার বছরের এক দীর্ঘ ও বৈচিত্র্যময় ইতিহাস। অধিকাংশ মানুষের ধারণা নুডলস কেবল চীনের অবদান, তবে প্রত্নতাত্ত্বিক প্রমাণ ও গবেষণায় এর বিবর্তন আরও বিস্তৃতভাবে ধরা দেয়।
প্রত্নতাত্ত্বিক দিক থেকে নুডলসের সবচেয়ে শক্তিশালী প্রমাণ পাওয়া যায় ২০০৫ সালে চীনের লাজিয়া নামক স্থানে। সেখানে মাটির নিচে চাপা পড়া একটি পাত্র থেকে প্রায় চার হাজার বছর পুরোনো নুডলসের চিহ্ন উদ্ধার করেন গবেষকরা। এটি দেখতে অনেকটা ঐতিহ্যবাহী হাতে টানা 'লামিয়ান' নুডলসের মতো। যদিও বিজ্ঞানীদের মধ্যে এ নিয়ে কিছু বিতর্ক বিদ্যমান, তবে এটিই এখন পর্যন্ত সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য প্রমাণ। ইতিহাসবিদদের মতে, হান রাজবংশের সময় এই খাবারটি সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন খাদ্যতালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়। সেই সময়ে গমের আটা মেখে সুতার মতো লম্বা করে সেদ্ধ করা হতো এবং এটি স্যুপ, ঝোল কিংবা মাংস ও সবজির সঙ্গে পরিবেশন করা হতো।
নুডলসের উৎস নিয়ে অনেক কাল্পনিক গল্প প্রচলিত আছে। যেমন 'দ্য স্টোরি অব নুডলস' বইটিতে তিন শিশুর দুষ্টুমির মাধ্যমে নুডলস আবিষ্কারের গল্প বলা হয়েছে, যা সম্পূর্ণই কল্পকাহিনী। আবার মার্কো পোলো চীন থেকে ইতালিতে পাস্তা নিয়ে গিয়েছিলেন বলে মনে করা হয়, তবে আধুনিক ইতিহাসবিদরা এর সাথে একমত নন। তাঁদের ধারণা, আরব বণিকদের মাধ্যমেই ইউরোপে পাস্তার মতো খাবারের প্রচলন শুরু হয়েছিল, যা মার্কো পোলোর জন্মের আগে থেকেই বিদ্যমান ছিল।
দেশভেদে নুডলসের রূপ ও স্বাদে এসেছে ব্যাপক পরিবর্তন। চীনে এক হাজারেরও বেশি প্রজাতির নুডলস পাওয়া যায়—যার মধ্যে চালের গুঁড়ায় তৈরি রাইস নুডলস এবং মুগডালের স্টার্চ দিয়ে তৈরি স্বচ্ছ গ্লাস নুডলস উল্লেখযোগ্য। জাপানে এই খাবারটি উডন, সোবা ও রামেন হিসেবে পরিচিত, আর কোরিয়ায় এর রূপ হয়েছে নেংমিয়ন। ইতালিতে এটি পাস্তা হিসেবে এবং মধ্যপ্রাচ্যে ঘন স্যুপের অংশ হিসেবে জনপ্রিয়। চীনের সংস্কৃতিতে দীর্ঘ নুডলস দীর্ঘায়ুর প্রতীক হিসেবে গণ্য করা হয়, তাই জন্মদিনে এটি না ভেঙে খাওয়ার রীতি রয়েছে।
আধুনিক যুগে নুডলসের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় মোড় আসে ইনস্ট্যান্ট নুডলসের উদ্ভাবনের মাধ্যমে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী জাপানের খাদ্যসংকট দূর করতে মোমোফুকু আন্দো এমন একটি খাবার তৈরি করতে চেয়েছিলেন যা সুস্বাদু হবে, দ্রুত রান্না হবে এবং দীর্ঘকাল সংরক্ষণ করা যাবে। দীর্ঘ গবেষণার পর ১৯৫৮ সালে তিনি বিশ্বের প্রথম ইনস্ট্যান্ট নুডলস 'চিকেন রামেন' বাজারে আনেন এবং ১৯৭১ সালে উদ্ভাবন করেন কাপ নুডলস। এই আবিষ্কারটিই নুডলসকে সাধারণ ঘরের গণ্ডি ছাড়িয়ে ভ্রমণকারী, ছাত্র এবং পেশাজীবীদের প্রতিদিনের খাদ্যতালিকায় স্থায়ী জায়গা করে দেয়।
বর্তমানে শিল্পায়নের ফলে যন্ত্রে নুডলস তৈরি হলেও চীনের অনেক শহরে এখনো হাতে তৈরি নুডলসের ঐতিহ্য টিকে আছে, যেখানে রাঁধুনিরা চোখের সামনে আটা টেনে লম্বা নুডলস তৈরি করেন। চার হাজার বছর আগে একটি নির্দিষ্ট অঞ্চল থেকে শুরু হওয়া এই খাবার আজ বিশ্বজুড়ে তার নিজস্ব স্থান করে নিয়েছে।




