চট্টগ্রামের কৃষিপাড়ে আমন ধানের ফলন বাড়লেও মুনাফার হিসেবে পিছিয়ে পড়ছেন চাষিরা। উচ্চফলনশীল ও হাইব্রিড জাতের ধান চাষের ফলে উৎপাদন বাড়লেও শ্রমিকের উচ্চ মজুরি এবং অন্যান্য কৃষি উপকরণের ব্যয় বৃদ্ধির কারণে কৃষকদের হাতে খুব সামান্য অর্থ থাকছে। সন্দ্বীপ উপজেলার সন্তোষপুর ইউনিয়নের কৃষক নাজিম উদ্দিনের অভিজ্ঞতা তেমনই। প্রায় ৬৫ একর জমিতে লেম্বু, নাজিরশাইল ও কালিজিরা জাতের ধান চাষ করা নাজিম উদ্দিন জানান, ফলন ভালো হলেও খরচের চাপে লাভ খুব সীমিত। তাঁর হিসেবে, ধান কাটার আগেই প্রতি কানিতে ব্যয় হয়েছে প্রায় ২২ হাজার টাকা, আর ধান কাটার মজুরি যোগ করলে এই খরচ ২৮ থেকে ৩০ হাজার টাকায় দাঁড়াবে। অথচ ধানের বিক্রয়মূল্য প্রতি মণ ১ হাজার থেকে ১ হাজার ১০০ টাকার মধ্যে সীমাবদ্ধ।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬-২৭ মৌসুমে চট্টগ্রামে ১ লাখ ৮০ হাজার ৩৫২ হেক্টর জমিতে আমন চাষ হচ্ছে। এখানে ব্রি ধান-৪৯, ৫১, ৫২, ৮৭ ও ১০৩-এর মতো উচ্চফলনশীল জাতের পাশাপাশি ভারতীয় পাইজাম, বিন্নি ও কুমড়া বৈলামের মতো স্থানীয় জাতের চাষ চলছে। গত পাঁচ বছরে আমন আবাদ সামান্য কমলেও উৎপাদন প্রায় ২০ হাজার টন বৃদ্ধি পেয়েছে। তবে এই উৎপাদন বৃদ্ধির সুফল কৃষকের পকেটে পৌঁছাচ্ছে না। শ্রমিকের দৈনিক মজুরি ৮০০ টাকা এবং সাথে তিন বেলা খাবারের খরচ মিলিয়ে মোট ব্যয় ১ হাজার ২০০ টাকা পর্যন্ত হয়ে যাচ্ছে, যা উৎপাদন খরচকে বহুগুণ বাড়িয়ে দিচ্ছে।

এমন পরিস্থিতিতে অনেক কৃষক এখন ধান চাষের বদলে সবজি চাষে আগ্রহী হচ্ছেন। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক আপ্রু মারমার মতে, আমন ধান ফলন পেতে সাড়ে তিন থেকে চার মাস সময় লাগে, যেখানে অনেক সবজি দেড় থেকে দুই মাসেই বাজারজাত করা যায়। এছাড়া সবজি চাষে শ্রম ও সময়ের তুলনায় মুনাফা ১৫ থেকে ২০ শতাংশ বেশি পাওয়ার সম্ভাবনা থাকে। তবে বর্ষাকালে সেচের প্রয়োজন কম হয় এবং আমন ধানের পরিচর্যা সবজির চেয়ে সহজ বলে অনেকে এই চাষ ধরে রেখেছেন।

সার সংগ্রহ এবং ধান বিক্রির ক্ষেত্রেও কৃষকদের ভোগান্তির কথা জানা গেছে। নাজিম উদ্দিনের অভিযোগ, সরকারিভাবে সার না পেয়ে অন্য ডিলারের কাছ থেকে বেশি দামে কিনতে হয়েছে এবং সরকারি গুদামে ধান বিক্রির সুযোগ না থাকায় ব্যবসায়ীদের কাছেই কম দামে ধান ছাড়তে হয়েছে। বাঁশখালীর আবদুল হাকিম এবং চন্দনাইশের মোতালেব ইসলামের মতো কৃষকের অভিযোগ, ধানের ন্যায্য মূল্য না পাওয়ায় তাঁদের লাভ অত্যন্ত সীমিত হয়ে পড়েছে। কৃষি কর্মকর্তাদের হিসাবে, এক কানি জমিতে আমন চাষে খরচ ২০-২২ হাজার টাকা হলে এবং ২৫ মণ ধান পাওয়া গেলে, প্রতি মণ ১ হাজার টাকায় বিক্রি করে মাত্র ৩ থেকে ৫ হাজার টাকা লাভ থাকে। জমির ভাড়া ও নিজস্ব শ্রমের মূল্য ধরলে এই লাভ আরও কমে যায়।

পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২১-২২ অর্থবছরে চট্টগ্রামে আমন উৎপাদন ছিল ৫ লাখ ১০ হাজার ২২৯ টন, যা ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বেড়ে ৫ লাখ ৩০ হাজার ৬২৬ টনে দাঁড়িয়েছে। যদিও আবাদি জমি কিছুটা কমেছে, কিন্তু উচ্চফলনশীল জাতের কারণে হেক্টরপ্রতি উৎপাদন বেড়েছে। তবে কৃষি বিভাগ লবণাক্ততা, সেচসংকট এবং শিল্পকারখানার কারণে আবাদি জমি হ্রাস পাওয়াকে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখছে। জেলায় বর্তমানে ৩৬ হাজার হেক্টরের বেশি লবণাক্ত জমি রয়েছে।

কৃষকদের এই সংকট দূর করতে আধুনিক যন্ত্রের ব্যবহার এবং ন্যায্য দাম নিশ্চিত করার পরামর্শ দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা। বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণায় দেখা গেছে, কম্বাইন হারভেস্টারের মাধ্যমে ধান কাটলে খরচ প্রায় ৫৮ শতাংশ কমে। এছাড়া সরকারি সংগ্রহমূল্য (১ হাজার ৩৬০ টাকা) অনুযায়ী ধান বিক্রির সুযোগ নিশ্চিত করা এবং সময়মতো মানসম্মত বীজ ও সার সরবরাহ করা গেলে কৃষকেরা উৎপাদন বৃদ্ধির প্রকৃত সুফল পাবেন বলে মনে করা হয়।