সিলেটের শহরতলিতে অবস্থিত লাক্কাতুরা চা-বাগানের সবুজ টিলা আর ঢেউখেলানো দৃশ্য বাইরে থেকে যতটা মনোরম মনে হয়, এর ভেতরের জীবন ততটাই কঠিন। এখানে কর্মরত ঊষামণির জীবন যেন এই বাগানের অধিকাংশ শ্রমিকেরই প্রতিচ্ছবি। জন্ম তারিখ বা সঠিক বয়স জানা না থাকলেও, তিন দশক আগে শ্বশুরের মৃত্যুর পর বদলি শ্রমিক হিসেবে তিনি এই পেশায় আসেন। প্রতিদিন ভোরে মেঠো পথ ধরে চা-পাতা সংগ্রহে যাওয়া এবং দিনশেষে গৃহস্থালির কাজ ও সংসারের হিসাব মেলাতেই কেটে যায় তাঁর জীবন।
আর্থিক হিসাবের দিকে তাকালে দেখা যায়, একজন চা-শ্রমিকের সাপ্তাহিক মজুরি ১ হাজার ৩১৫ টাকা এবং সাথে সাড়ে ৩ কেজি আটা। তবে এই মজুরি পাওয়ার শর্ত হিসেবে প্রতিদিন নির্দিষ্ট পরিমাণ পাতা তুলতে হয়। লাক্কাতুরা বাগানে প্রতিদিন ২৩ কেজির কম পাতা তুললে তাকে 'লেস হাজিরা' হিসেবে গণ্য করা হয়, যার ফলে মজুরি কমে যায়। অন্যদিকে, ২৩ কেজির বেশি পাতা তুলতে পারলে প্রতি অতিরিক্ত কেজির জন্য ৫ টাকা করে বাড়তি অর্থ পাওয়া যায়। এই সামান্য বাড়তি আয়ের আশায় শ্রমিকরা কাজের সময় গল্পগুজব এড়িয়ে কেবল পাতায় মনোযোগ দেন। ১৩ বছর বয়স থেকে এই কাজে যুক্ত সুমিত্রা ভূমিজের মতো অনেকেই পারিবারিক উত্তরাধিকার সূত্রে এই পেশায় এসেছেন।
তবে কেবল নারী শ্রমিকরাই নন, পুরুষ শ্রমিকদের জীবনও সংঘাতময়। সুনীল লোহার নামের এক শ্রমিক জানান, পাঁচ সদস্যের পরিবার নিয়ে তিনি একাই কাজ করেন। ২০ হাজার টাকা ঋণ নিয়ে ঘর মেরামত করায় প্রতি সপ্তাহে ৭০০ টাকা কিস্তি দিতে হয়। ফলে হাতে থাকা সামান্য টাকা দিয়ে সংসার চালানো প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে। তাঁর কণ্ঠে ফুটে ওঠে দীর্ঘদিনের জমে থাকা কষ্টের আর্তনাদ।
তবে এই অন্ধকারের মাঝেও কিছু আশার আলো আছে। বাগানের স্টোর পরিচ্ছন্নক এবং শ্রমিক চঞ্চল বাকতি মনে করেন, দুঃখের পাশাপাশি এখানে আনন্দের সুযোগও রয়েছে। পূজা, চড়কপূজা, ঝুমুর গান, কাঠিনৃত্য এবং চা-চয়ন উৎসবের মাধ্যমে শ্রমিকেরা নিজেদের মানসিক প্রশান্তি খুঁজে নেন। এছাড়া এখনো এখানে যৌথ পরিবারের দৃঢ় বন্ধন বিদ্যমান। চঞ্চল নিজে পড়াশোনার চেষ্টা করলেও কাজের চাপে মাঝপথে তা ছেড়ে দিতে বাধ্য হন এবং শেষ পর্যন্ত এই পেশাতেই থিতু হন।
বাংলাদেশ চা-শ্রমিক ইউনিয়নের সিলেট ভ্যালির কার্যকরী পরিষদের সভাপতি রাজু গোয়ালা একটি মৌলিক সমস্যার কথা উল্লেখ করেন। তিনি জানান, প্রজন্মের পর প্রজন্ম এই মাটিতে কাজ করলেও শ্রমিকদের নিজস্ব কোনো ভূমির অধিকার নেই; তাঁদের কেবল মাথা গোঁজার ঘর আছে। তবে গত দশ বছরে পরিস্থিতির কিছুটা পরিবর্তন দেখা গেছে। উন্নত জীবনের আশায় অনেকে এখন পেশা বদলাচ্ছেন এবং শিক্ষার নতুন দুয়ার উন্মুক্ত হচ্ছে। কেউ কেউ এই সুযোগ নিয়ে এগিয়ে গেলেও, ঊষামণিদের মতো অনেকে এখনো অভাব ও অনিশ্চয়তার পুরোনো বৃত্তে আটকা পড়ে আছেন। সবুজের এই মায়াবী পর্দার আড়ালে একদিকে যেমন রয়েছে না-পাওয়ার দীর্ঘশ্বাস, অন্যদিকে রয়েছে ঘুরে দাঁড়ানোর স্বপ্ন।




