দেশের বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে পোশাকশ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি ৩০ হাজার টাকা করার দাবিতে চলমান বিক্ষোভকে কেন্দ্র করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক অপপ্রচার চালানো হচ্ছে। পুলিশ ও শ্রমিকদের সংঘর্ষের এই পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে ফেসবুকসহ বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মে ছড়িয়ে পড়া অন্তত ৪৭টি মিথ্যা তথ্য শনাক্ত করেছেন ফ্যাক্ট চেকিং প্রতিষ্ঠানগুলো। এর মধ্যে রিউমর স্ক্যানার ৩৩টি, ডিসমিসল্যাব ৮টি এবং বাংলা ফ্যাক্ট ৬টি বিভ্রান্তিকর ঘটনার প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে।

তদন্তে দেখা গেছে, শ্রমিকদের মৃত্যু ও গুলিবিদ্ধ হওয়ার বিষয়ে সবচেয়ে বেশি মিথ্যা দাবি করা হয়েছে। ৪ নভেম্বর হেমায়েতপুরে পাঁচজন এবং ৩ নভেম্বর আশুলিয়ায় আটজন শ্রমিক পুলিশের গুলিতে নিহত হওয়ার খবর ছড়িয়ে দেওয়া হয়, যার কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। এমনকি একজন স্কুল শিক্ষার্থীর মাথায় ইটের টুকরো লেগে আহত হওয়াকে 'গুলিবিদ্ধ' বলে প্রচার করা হয়। আবার সাভারে অসুস্থ হয়ে মারা যাওয়া এক নারী শ্রমিকের ভিডিও ব্যবহার করে দাবি করা হয়, তাকে হত্যা করে লাশ গুম করা হয়েছে। তবে গাজীপুরে তৌফিক হোসেন নামে এক শ্রমিকের মৃত্যুর খবরটি সত্য বলে নিশ্চিত করা হয়েছে।

প্রযুক্তির অপব্যবহার করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই-এর মাধ্যমে তৈরি করা ছবি ও ভিডিওর মাধ্যমে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করা হচ্ছে। মিরপুরে কারখানায় ভাঙচুর এবং পুলিশের গুলি চালানোর কিছু ভিডিও এআই দিয়ে তৈরি করা হয়েছে বলে প্রমাণিত হয়েছে। এছাড়া বিএনপি নেতা-কর্মীদের লাঠি হাতে থাকার একটি ছবিকে সম্পাদনা করে তাঁদের হাতে আগ্নেয়াস্ত্র এবং পেছনে পুলিশ সদস্যদের যুক্ত করে ছড়িয়ে দেওয়া হয়।

গণমাধ্যমের লোগো ব্যবহার করে ভুয়া ফটোকার্ড তৈরির ঘটনাও ঘটেছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের নামে শ্রমিকদের পরিণতি আওয়ামী লীগের মতো হবে—এমন একটি মিথ্যা বক্তব্য প্রচারিত হয়। এছাড়া রুহুল কবির রিজভীর নামে শ্রমিকদের বেতন নিয়ে অবমাননাকর মন্তব্য এবং শ্রমিকদের 'লং মার্চ টু ঢাকা'র কর্মসূচির দাবিগুলোও সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন বলে জানানো হয়েছে।

ভুল তথ্য ছড়ানোর জন্য পুরনো ও ভিন্ন ঘটনার ভিডিও ব্যবহার করা হচ্ছে। উদাহরণস্বরূপ, ২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলনের ভিডিও, মোংলা সফরের সময় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সাধারণ মানুষের সাথে মেশার দৃশ্য এবং এমনকি টুঙ্গিপাড়ায় আওয়ামী লীগ কর্মীদের শপথ নেওয়ার ভিডিওকে বর্তমান শ্রমিক আন্দোলনের সাথে জুড়ে দেওয়া হয়েছে। এছাড়া গত জুনের ফেনীর একটি হত্যাকাণ্ডের ছবিকে সাম্প্রতিক শ্রমিক হত্যার দাবি করে প্রচার করা হয়, যা সাবেক প্রতিমন্ত্রী মোহাম্মদ আলী আরাফাতও শেয়ার করেছিলেন।

বেতনকাঠামো এবং ব্যবসায়িক ব্যক্তিত্বদের বিষয়েও গুজব ছড়ানো হয়েছে। শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের নাম দিয়ে একটি ভুয়া বেতন তালিকা প্রচার করা হয়, যদিও নতুন মজুরি নির্ধারণের প্রক্রিয়া এখনো চলমান। এছাড়া হা-মীম গ্রুপের কর্ণধার এ কে আজাদকে গ্রেপ্তার করার দাবি করা হলেও তার কোনো সত্যতা পাওয়া যায়নি। প্যাসিফিক জিনস লিমিটেডের সব কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে বলে যে ভিডিও প্রচারিত হয়েছিল, যাচাইয়ে দেখা যায় কেবল একটি পুরনো ভবন ভেঙে ফেলার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, বাকি সব কার্যক্রম স্বাভাবিক রয়েছে।