যুক্তরাষ্ট্রে উদ্যোক্তা হওয়ার জোয়ার বইছে, কিন্তু সেই সাফল্যের চাকচিক্যের আড়ালে লুকিয়ে আছে এক ভিন্ন বাস্তবতা। সফটওয়্যার কোম্পানি জিরো (Xero)-র প্রধান নির্বাহী মনে করেন, কেবল ব্যবসার প্রবৃদ্ধির পরিসংখ্যান দিয়ে উদ্যোক্তাদের প্রকৃত সাফল্যের পরিমাপ করা সম্ভব নয়। তার মতে, ব্যবসার আয় বাড়লে বা নতুন প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠলেই যে তার মালিক ব্যক্তিগতভাবে লাভবান হচ্ছেন, তেমন কোনো নিশ্চয়তা নেই।

পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৫ সালে যুক্তরাষ্ট্রে প্রায় ৫৭ লাখ নতুন ব্যবসার আবেদন জমা পড়েছে, যা একটি নতুন রেকর্ড। এই প্রবৃদ্ধির পেছনে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই-এর বড় ভূমিকা ছিল; নতুন উদ্যোক্তাদের মধ্যে ৬০ শতাংশই জানিয়েছেন যে তারা ব্যবসা শুরু করতে এআই ব্যবহার করেছেন, যা আগের বছরের তুলনায় দ্বিগুণ। ক্ষুদ্র ব্যবসাগুলো ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করে এবং প্রচুর কর্মসংস্থান সৃষ্টি করে। তবে এই সবকিছুর পেছনে যে উদ্যোক্তা মূল ঝুঁকি নিয়ে কাজ করছেন, তিনি অনেক সময় প্রশ্ন করেন—এত পরিশ্রমের পর প্রাপ্তি কি আসলেই সার্থক?

জিরো সিইও এই পরিস্থিতিকে 'ওনারশিপ গ্যাপ' (Ownership Gap) হিসেবে সংজ্ঞায়িত করেছেন। তিনি লক্ষ্য করেছেন, বর্তমানে আমরা রাজস্ব, কর্মসংস্থান এবং জিডিপি-র মতো মাপকাঠিতে ব্যবসার স্বাস্থ্য বিচার করি, কিন্তু মালিক ব্যক্তিগতভাবে জীবনধারণের জন্য পর্যাপ্ত আয় করছেন কি না, তা খতিয়ে দেখা হয় না। জিরো-র অংশীদার গুস্টো (Gusto)-র তথ্যমতে, ২০২৫ সালে একজন ক্ষুদ্র ব্যবসা মালিকের মাসিক গড় আয় ছিল ৪,৮০০ ডলার, যা বছরে প্রায় ৫৭,৬০০ ডলার। অথচ কাজের চাপ অত্যন্ত বেশি। অধিকাংশ মালিক সপ্তাহে অন্তত ৫০ ঘণ্টা কাজ করেন এবং ৬০ শতাংশই সপ্তাহে ছয় দিন বা তার বেশি সময় ব্যয় করেন। শুধু অর্থ ব্যবস্থাপনা এবং হিসাবরক্ষণের পেছনেই তারা মাসে গড়ে ২২ ঘণ্টা সময় ব্যয় করেন।

তার মতে, ব্যবসার প্রবৃদ্ধি এবং ব্যক্তিগত জীবনের উন্নতির মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। একটি ব্যবসা বড় হওয়ার অর্থ এই নয় যে মালিকের জীবন মান উন্নত হয়েছে। অনেক সময় দেখা যায়, ব্যবসার প্রবৃদ্ধি মালিকের জীবনকে সমৃদ্ধ করার বদলে তাকে নিঃশেষ করে দিচ্ছে। তাই কেবল প্রফিট অ্যান্ড লস (P&L) স্টেটমেন্ট না দেখে মালিকের আর্থিক স্থিতিস্থাপকতা, সময়ের নিয়ন্ত্রণ এবং মানসিক প্রশান্তির মতো বিষয়গুলোকেও গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।

এই সংকট সমাধানে তিনি নীতিনির্ধারক, অর্থনীতিবিদ এবং বিনিয়োগকারীদের আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি মনে করেন, কেবল আউটপুট বা প্রবৃদ্ধির পেছনে না ছুটে উদ্যোক্তার জীবনযাত্রার মানের ওপর গুরুত্ব দেওয়া উচিত। যদি আমরা কেবল প্রবৃদ্ধিকে প্রাধান্য দিই, তবে এমন এক ব্যবস্থা তৈরি হবে যেখানে ব্যবসা সফল হবে কিন্তু মালিকটি অবসাদে (burnout) ভুগবেন।

সমাধান হিসেবে তিনি প্রস্তাব করেছেন, প্রচলিত মাপকাঠির পাশাপাশি 'মালিকের স্বাস্থ্য' বা 'ওনার হেলথ মেট্রিকস' যুক্ত করতে হবে। যখন নতুন ব্যবসা শুরুর হার বাড়বে, তখন দেখতে হবে সেগুলো প্রকৃত অর্থে মালিকের জন্য কতটা আয় তৈরি করছে। ব্যবসায়িক বিক্রয় বাড়লে দেখতে হবে মালিকের আর্থিক নিরাপত্তা বাড়ছে কি না। জিরো সিইওর মতে, একটি সুস্থ ক্ষুদ্র ব্যবসা অর্থনীতি সেটাই, যেখানে ব্যবসা এবং তার নির্মাতা—উভয়ই স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদে একসাথে সফল হয়।