মেটা প্রধান মার্ক জাকারবার্গের মোট সম্পদের পরিমাণ এখন ২০০ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে। তবে এই বিপুল সম্পদের অধিকাংশ তার তিন সন্তান উত্তরাধিকার সূত্রে পাবেন না। ২০১৫ সালে প্রিসিলা চ্যান এবং মার্ক জাকারবার্গ তাদের ফেসবুক (বর্তমানে মেটা) শেয়ারের ৯৯ শতাংশ দান করার কথা ঘোষণা করেছিলেন। সেই সময়ে ওই শেয়ারের বাজারমূল্য ছিল প্রায় ৪৫ বিলিয়ন ডলার। বর্তমানে তাদের সম্পদের পরিমাণ বহুগুণ বৃদ্ধি পেলেও সেই অঙ্গীকারটি অপরিবর্তিত রয়েছে।

বিল গেটস, ওয়ারেন বাফেট এবং মাইকেল ব্লুমবার্গের মতো বিশ্বের অতি-ধনী ব্যক্তিদের তালিকায় এখন জাকারবার্গ ও চ্যান দম্পতিও যুক্ত হলেন, যারা তাদের সন্তানদের জন্য সম্পদের মূল অংশ রেখে যাওয়ার পরিবর্তে তা জনকল্যাণে ব্যয় করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। ২০১৫ সালের ডিসেম্বরে তাদের প্রথম সন্তান ম্যাক্সিমার জন্মের পর তারা একটি খোলা চিঠির মাধ্যমে 'চ্যান জাকারবার্গ ইনিশিয়েটিভ' (CZI)-এর কথা জানান। সেখানে তারা লিখেছিলেন যে, সকল বাবা-মায়ের মতো তারাও চান তাদের সন্তানরা বর্তমান বিশ্বের চেয়ে আরও উন্নত এক পৃথিবীতে বড় হয়ে উঠুক। কেবল বর্তমান বাসিন্দাদের জন্য নয়, বরং আগত প্রজন্মের জীবনযাত্রার মানোন্নয়নে বিনিয়োগ করা সমাজের দায়িত্ব বলে তারা মনে করেন।

সাধারণত ধনী ব্যক্তিদের সম্পদ পরবর্তী প্রজন্মের কাছে হস্তান্তরের একটি বড় প্রবণতা রয়েছে, যেখানে বেবি বুমার প্রজন্মের কাছ থেকে তরুণ প্রজন্মের কাছে প্রায় ১২৪ ট্রিলিয়ন ডলার স্থানান্তরিত হবে বলে ধারণা করা হয়। এই ধারার বিপরীতে জাকারবার্গের এই সিদ্ধান্তটি অত্যন্ত ব্যতিক্রমী। এছাড়া ক্যালিফোর্নিয়া অঙ্গরাজ্যের প্রস্তাবিত 'বিলিয়নেয়ার ট্যাক্স' বা ধনকুবের করের প্রভাব থেকেও তার সম্পদ রক্ষা পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। প্রপোজিশন ৪০-এর মাধ্যমে ধনকুবেরদের মোট সম্পদের ওপর ৫% কর আরোপের কথা থাকলেও, এর বিপরীতে প্রপোজিশন ৪২-এর সমর্থন বেশি দেখা যাচ্ছে, যা নতুন কোনো সম্পদ কর আরোপ নিষিদ্ধ করতে পারে। এই করের আশঙ্কায় জাকারবার্গ একসময় অঙ্গরাজ্য ছেড়ে চলে যাওয়ার কথা ভেবেছিলেন এবং মেটা বোর্ড তার জন্য বিশেষ ধরনের স্টক তৈরির ব্যবস্থা করেছিল।

জাকারবার্গের এই দান করার প্রক্রিয়াটি একটি প্রথাগত ফাউন্ডেশনের বদলে 'লিমিটেড লায়াবিলিটি কোম্পানি' (LLC) হিসেবে পরিচালিত হচ্ছে। এর ফলে তারা বিনিয়োগের সময় এবং কারণ নির্বাচনে অধিক স্বাধীনতা পান এবং মুনাফামুখী কোম্পানিতে বিনিয়োগ বা নীতিগত প্রচারণায় অর্থায়ন করতে পারেন। বিল গেটস গত বছর ফরচুন ম্যাগাজিনকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে জাকারবার্গের এই দান করার মডেলের প্রশংসা করেছেন এবং জানিয়েছেন যে, তারা শিক্ষা গবেষণার ক্ষেত্রে একে অপরকে সহযোগিতা করেন।

চ্যান জাকারবার্গ ইনিশিয়েটিভ শুরুতে ক্যালিফোর্নিয়ার আবাসন সমস্যা এবং অপরাধ বিচার ব্যবস্থার সংস্কারের মতো সামাজিক ইস্যুতে কাজ করলেও, বর্তমানে তাদের মূল মনোযোগ প্রযুক্তি-নির্ভর অগ্রাধিকারের দিকে। বিশেষ করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) চালিত বায়োমেডিক্যাল গবেষণায় তারা গুরুত্ব দিচ্ছেন। তবে এই অঙ্গীকারের মানে এই নয় যে জাকারবার্গ অত্যন্ত সাধারণ জীবনযাপন করবেন। মেটার প্রায় ১৩% শেয়ার এখনও তার কাছে রয়েছে, যা তাকে কোম্পানির অধিকাংশ ভোটিং কন্ট্রোল প্রদান করে। পাশাপাশি তিনি মিয়ামিসহ আমেরিকার বিভিন্ন স্থানে বিশাল রিয়েল এস্টেট পোর্টফোলিও গড়ে তুলেছেন। সন্তানদের প্রতি ভালোবাসার কথা উল্লেখ করে তারা চিঠিতে লিখেছিলেন, আগামী প্রজন্মের সব শিশুর প্রতি তাদের একটি নৈতিক দায়িত্ব রয়েছে এবং তারা সেই দায়িত্ব পালন করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।