বিশ্বজুড়ে ইলেকট্রিক ভেহিকেল (EV), ডেটা সেন্টার এবং রোবোটিক্স শিল্পের প্রসারের ফলে লিথিয়ামের চাহিদা আকাশচুম্বী হয়ে উঠেছে। এই দশকের শুরু থেকে লিথিয়ামের বৈশ্বিক চাহিদা ৪০০ শতাংশেরও বেশি বৃদ্ধি পেয়ে বর্তমানে বার্ষিক ১৫ লক্ষ মেট্রিক টনে পৌঁছেছে এবং ২০৩৫ সালের মধ্যে এটি ৪০ লক্ষ টনে গিয়ে ঠেকতে পারে। তবে বর্তমানে বিশ্বের মোট লিথিয়াম সরবরাহের মাত্র ১ শতাংশের কিছু বেশি উৎপাদন করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, আর পরিশোধনের জন্য দেশটি ব্যাপকভাবে চিনের ওপর নির্ভরশীল। এই কৌশলগত ঝুঁকি মোকাবিলা করতে আমেরিকার দক্ষিণ আরকানসাস এবং পূর্ব টেক্সাসের 'স্ম্যাকওভার ফরমেশন' (Smackover Formation) নামক এক অনন্য ভূ-তাত্ত্বিক অঞ্চল এখন কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে।

স্ম্যাকওভারে ভূগর্ভস্থ এক বিশাল অ্যাকুইফারে অত্যন্ত উচ্চ ঘনত্বের লিথিয়াম পাওয়া গেছে। স্ট্যান্ডার্ড লিথিয়ামের প্রধান নির্বাহী ডেভিড পার্কের মতে, এই অঞ্চলের ভূ-তাত্ত্বিক গঠন অত্যন্ত ব্যতিক্রমী এবং শুধুমাত্র তাদের হাতে থাকা জমি থেকেই বছরে ১ লক্ষ ৫০ হাজার টনের বেশি লিথিয়াম উৎপাদনের সম্ভাবনা রয়েছে। এই প্রকল্পের অগ্রযাত্রায় নেতৃত্ব দিচ্ছে স্ট্যান্ডার্ড লিথিয়াম, যারা ২০২৭ সালের প্রথম প্রান্তিকে তাদের দক্ষিণ-পশ্চিম আরকানসাস প্রজেক্টের (SWA) প্রথম পর্যায়ের কাজ শুরু করার পরিকল্পনা করেছে। এর পাশাপাশি অস্টিন ভিত্তিক প্রতিষ্ঠান এনার্জি-এক্স (EnergyX) ২০২৭ সালের শেষ নাগাদ তাদের ১৫ হাজার টনের 'প্রজেক্ট লোনস্টার' বাণিজ্যিক কেন্দ্র স্থাপনের প্রস্তুতি নিচ্ছে।

এই খনি উত্তোলনের আকর্ষণ শুধু ছোট কোম্পানিগুলোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই, বরং এক্সনমবিল এবং শেভরনের মতো তেল খাতের জায়ান্টরাও এতে বিনিয়োগ করেছে। এক্সনমবিলের দখলে বর্তমানে এই অঞ্চলের সবচেয়ে বড় ভূখণ্ড (৪ লক্ষ একরের বেশি) এবং তারা আগামী বছর থেকে একটি পাইলট প্রজেক্ট শুরু করার কথা জানিয়েছে। শেভরনও ১ লক্ষ ২৫ হাজার একর জমি কিনেছে। প্রথাগত খনি বা বাষ্পীভবন পুকুরের বদলে এখানে ব্যবহৃত হবে 'ডাইরেক্ট লিথিয়াম এক্সট্রাকশন' (DLE) প্রযুক্তি। এই পদ্ধতিতে তেলের কুয়োর মতো ড্রিলিং করে লবণাক্ত পানি তোলা হয়, সেখান থেকে লিথিয়াম আলাদা করে বাকি ৯০ শতাংশ পানি পুনরায় ভূগর্ভে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। এতে পরিবেশের ক্ষতি কম হয় এবং সময়ও অনেক সাশ্রয় হয়; যেখানে বাষ্পীভবন পদ্ধতিতে দুই বছর সময় লাগে, ডিএলই প্রযুক্তিতে মাত্র দুই দিনেই কাজ শেষ হয়।

তবে এই পথে কিছু চ্যালেঞ্জও রয়েছে। বিএমও ক্যাপিটাল মার্কেটের বিশ্লেষক ম্যাক্স ইয়ারিল মনে করেন, বাণিজ্যিক স্তরে ডিএলই প্রযুক্তির কার্যকারিতা এখনো পুরোপুরি প্রমাণিত নয় এবং চিনের বাজার নিয়ন্ত্রণ ও দাম কমানোর কৌশলের সামনে একে টিকে থাকতে হবে। এছাড়া ট্রাম্প প্রশাসনের ইভি ট্যাক্স ক্রেডিট বাতিলের ফলে অভ্যন্তরীণ বাজারে কিছুটা প্রভাব পড়তে পারে। তা সত্ত্বেও, দীর্ঘমেয়াদী লক্ষ্য হিসেবে ডিএলই-কেই একমাত্র পথ মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

লিথিয়াম উত্তোলনের এই দেশীয় প্রচেষ্টাকে দ্বিপক্ষীয় রাজনৈতিক সমর্থন মিলেছে। বাইডেন প্রশাসন এসডব্লিউএ প্রজেক্টের জন্য ২২৫ মিলিয়ন ডলার অনুদান দিয়েছে এবং ট্রাম্প প্রশাসন প্রকল্পের অনুমোদনে দ্রুত গতি এনেছে। এছাড়া নরওয়েজীয় কোম্পানি ইকুইনর এবং এলজি এনার্জি সলিউশনের মতো বড় সংস্থাও এতে যুক্ত হয়েছে। স্ট্যান্ডার্ড লিথিয়াম এবং এনার্জি-এক্স উভয়ই মনে করে যে, লিথিয়াম পরিশোধনের জন্য আর চিনির দিকে তাকাতে হবে না, যা মার্কিন জাতীয় নিরাপত্তার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাদের লক্ষ্য হলো লিথিয়ামকে তামার মতো একটি সাধারণ কিন্তু অপরিহার্য পণ্যে পরিণত করা, যা ভবিষ্যতে গ্রিড স্টোরেজ থেকে শুরু করে রোবোটিক্স পর্যন্ত সব ক্ষেত্রে শক্তি যোগাবে।