বই খুলে টেবিলে বসে থাকা আর প্রকৃতপক্ষে পড়া—এই দুইয়ের মধ্যে বিস্তর ফারাক। বিসিএসের প্রস্তুতিতে অনেক পরীক্ষার্থীই ঘণ্টার পর ঘণ্টা বইয়ের পাতায় চোখ বোলান, কিন্তু শেষ পর্যন্ত কতটুকু আয়ত্ত করেন, তা নিয়ে থাকে অনিশ্চয়তা। নতুন ব্যাচের শিক্ষার্থীরা প্রায়শই পরিচিত কারও ১০ বা ১২ ঘণ্টা পড়ার কথা শুনে নিজেও দীর্ঘ সময় ধরে পড়তে বসেন। তবে সফলতা নির্ভর করে টেবিলে কতক্ষণ থাকা যায়, তার ওপর নয়; বরং সেই সময়ের মধ্যে মনোযোগ কতটা গভীর, তার ওপর। ঘড়ির কাঁটার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো পাঠের গভীরতা, যা দিনশেষে ফলাফল নির্ধারণ করে।

প্রতিদিনের প্রস্তুতিকে সাজানো যায় পাঁচটি ভিন্ন ধাপে। প্রথম ঘণ্টাটি সম্পূর্ণ নতুন বিষয় বা অধ্যায়ের জন্য বরাদ্দ রাখা যেতে পারে। বাংলা ব্যাকরণ, ইংরেজি সাহিত্য, গণিত বা আন্তর্জাতিক বিষয়াবলি—যেকোনো একটি বিষয় বেছে নিয়ে নির্দিষ্ট লক্ষ্য স্থির করা জরুরি। যেমন, সংবিধানের নির্দিষ্ট অনুচ্ছেদ আত্মস্থ করা। লক্ষ্য যত স্পষ্ট হবে, মস্তিষ্কের জন্য তা গ্রহণ করা তত সহজ।

দ্বিতীয় ঘণ্টাটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। নতুন বিষয় পড়ার পরপরই বই বন্ধ করে স্মৃতি থেকে ঠিক কী শিখলাম, তা পরীক্ষা করা উচিত। গুরুত্বপূর্ণ সাল, সংজ্ঞা বা উপাত্ত না দেখে খাতায় লেখার চেষ্টা করতে হবে। শিক্ষাবিজ্ঞানে এই পদ্ধতিকে বলা হয় ‘সক্রিয় স্মরণ অনুশীলন’। গবেষণায় দেখা গেছে, বারবার বই পড়ার চেয়ে বই বন্ধ করে স্মৃতি থেকে তথ্য মনে করার অভ্যাস পড়া মনে রাখার হার প্রায় ৫০ শতাংশ বাড়িয়ে দেয়। তাই পড়া শেষে রিভিশনের বদলে নিজেকে প্রশ্ন করে উত্তর খোঁজার অভ্যাস করা উচিত।

তৃতীয় ঘণ্টায় বিগত বছরের প্রশ্নপত্রের মুখোমুখি হওয়া দরকার। বিসিএস শুধু জ্ঞান অর্জনের পরীক্ষা নয়, প্রশ্ন চেনার কৌশলও বটে। সংশ্লিষ্ট বিষয়ের আগের বছরের প্রশ্ন সমাধান করা এ সময়ের কাজ। ভারতের সিভিল সার্ভিস পরীক্ষায় শীর্ষস্থান পাওয়া শক্তি দুবেও আগের বছরের প্রশ্ন সমাধানের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, প্রশ্নপত্র পরীক্ষার ধরন বুঝতে এবং প্রস্তুতি ঠিক করতে সহায়তা করে। তাঁর সাফল্যের মূল মন্ত্র হলো ধারাবাহিকতা, কোনো শর্টকাট নয়।

চতুর্থ ঘণ্টাটি নিজের দুর্বলতা চিহ্নিত ও সংশোধনের জন্য। প্রশ্ন সমাধানের সময় কোনগুলোতে ভুল হলো, সেগুলো লাল কালিতে চিহ্নিত করতে হবে। গণিতে সময় বেশি লাগছে কিনা, সাধারণ জ্ঞানের সাল গুলিয়ে যাচ্ছে কিনা—এই ঘণ্টায় সেসব ভুল শুধরে নেওয়ার সুযোগ। প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় জয়ী হতে হলে নিজের দুর্বল জায়গাগুলোকে শক্তিতে রূপান্তর করতেই হবে।

পঞ্চম ও শেষ ঘণ্টাটি পুরো দিনের পড়ার সারসংক্ষেপ বা রিভিশনের জন্য। সকাল থেকে যা পড়া হয়েছে, তা এক নজরে দেখে নিয়ে ভুল প্রশ্নগুলো আরও একবার চর্চা করা যায়। রাতে ঘুমানোর আগে নিজেকে তিনটি প্রশ্ন করা যেতে পারে—আজ নতুন কী শিখলাম, কী ভুল করলাম এবং আগামীকাল কোন বিষয় নিয়ে পড়ব। এই তিন প্রশ্নের স্পষ্ট উত্তর থাকলে প্রস্তুতি কখনো এলোমেলো হবে না।

তবে মনে রাখতে হবে, পাঁচ ঘণ্টা কোনো জাদুর সংখ্যা নয়। কারও জন্য এই সময় যথেষ্ট হতে পারে, কারও আবার আরও বেশি প্রয়োজন। মূল বিষয় হলো সময়কে সঠিকভাবে কাজে লাগানো। ১০ ঘণ্টা পড়েও যদি প্রতি আধঘণ্টায় মোবাইল দেখা হয়, তাহলে সেই সময়ের হিসাব অর্থহীন। আর পাঁচ ঘণ্টা যদি সত্যিকারের মনোযোগ দিয়ে পড়া হয়, তাহলে সেই সময়ই সাফল্য এনে দিতে পারে। বিসিএসের প্রস্তুতিতে তাই নিজেকে প্রশ্ন করতে হবে—আজ কত ঘণ্টা পড়লাম, তা নয়; বরং যে সময় পড়লাম, তার কতটুকু সত্যিই মনে রাখতে পেরেছি।