বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকের ঘাটতি ও অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতার কারণে পাঠদান ও গবেষণার পরিবেশ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। ২০১২ সালের ২৪ জানুয়ারি ছয়টি বিভাগ ও চারটি অনুষদে মাত্র ৪০০ শিক্ষার্থী নিয়ে যাত্রা শুরু করা এই প্রতিষ্ঠানটি বর্তমানে ২৫টি বিভাগে স্নাতক ও ২৪টি বিভাগে স্নাতকোত্তর পর্যায়ে শিক্ষা কার্যক্রম চালাচ্ছে। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, এখন শিক্ষার্থীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১০ হাজার ১৪৫ জনে। প্রতিবছর শিক্ষার্থীর সংখ্যা বাড়লেও সেই তুলনায় শিক্ষকের সংখ্যা বৃদ্ধি পায়নি; ফলে শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা ক্রমেই ব্যাহত হচ্ছে।

বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়ে কর্মরত শিক্ষকের সংখ্যা ২১০। তাঁদের মধ্যে ৬২ জন উচ্চশিক্ষার জন্য শিক্ষা ছুটিতে বিদেশে অবস্থান করছেন। ফলে নিয়মিত পাঠদানে নিয়োজিত রয়েছেন মাত্র ১৪৮ জন শিক্ষক। এ অবস্থায় গড়ে ৬৯ শিক্ষার্থীর বিপরীতে একজন শিক্ষক দায়িত্ব পালন করছেন। যদিও মোট কর্মরত শিক্ষকের হিসেবে অনুপাত ৪৮:১, তবু ছুটির কারণে বাস্তব চিত্র আরও সংকটজনক। উচ্চশিক্ষার মানসম্মত পরিবেশের জন্য বিশেষজ্ঞরা শিক্ষক-শিক্ষার্থী অনুপাত ১:২০-কে আদর্শ হিসেবে দেখেন; যদিও এটি ইউজিসির কোনো বাধ্যতামূলক নির্দেশনা নয়।

শিক্ষক পদে শূন্যতার চিত্রও উদ্বেগজনক। জনবল কাঠামোতে অধ্যাপকের পদ ৪৯টি থাকলেও বর্তমানে রয়েছেন মাত্র একজন। শিক্ষকের মোট পদ ৪০১টি; এর মধ্যে ইউজিসির অনুমোদনপ্রাপ্ত পদ ২৬০টি। অনুমোদিত পদের বিপরীতে ৫০টি পদ এখনো খালি। কর্মরত ২১০ জনের মধ্যেও ৬২ জন অনুপস্থিত থাকায় শ্রেণিকক্ষ, গবেষণা তত্ত্বাবধান এবং একাডেমিক নেতৃত্ব—সবক্ষেত্রেই চাপ তীব্রতর হয়েছে। শিক্ষকেরা জানিয়েছেন, শ্রেণিকক্ষে পাঠদানের পাশাপাশি পরীক্ষা নেওয়া, খাতা মূল্যায়ন, গবেষণা তত্ত্বাবধান, প্রশাসনিক দায়িত্ব ও বিভিন্ন কমিটির কাজ করতে হয়। ফলে কাগজে-কলমে অনুপাত যা দেখায়, বাস্তবে একজন শিক্ষকের ওপর চাপ আরও বেশি।

শ্রেণিকক্ষের অভাব পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে। বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা গেছে, ২৫টি বিভাগের প্রায় ১৫০টি ব্যাচের পাঠদানের জন্য অন্তত ৭৫টি শ্রেণিকক্ষ প্রয়োজন। কিন্তু বর্তমানে রয়েছে মাত্র ৩৬টি। বাংলা বিভাগের চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী মৃত্যুঞ্জয় রায় জানান, তাঁদের বিভাগের নিজস্ব একটি এবং ভাগাভাগির জন্য আরেকটি—মাত্র দুটি কক্ষ রয়েছে। প্রতি সেমিস্টারে ৩০ থেকে ৩৫টি ক্লাস থাকায় নিয়মিত পাঠদান ব্যাহত হচ্ছে। ১৬ আগস্ট ক্যাম্পাসে গিয়ে দেখা যায়, একাডেমিক ভবনের নিচতলায় বাংলা বিভাগের সম্মান চতুর্থ বর্ষের ক্লাস নির্ধারিত সময়ের আধ ঘণ্টা আগে শেষ করতে হয়েছে; কারণ একই কক্ষে স্নাতকোত্তর শ্রেণির পরীক্ষা চলছিল। শিক্ষার্থী মো. রাজিব বলেন, কক্ষ-সংকটের কারণে এমন ঘটনা প্রতিনিয়ত ঘটছে।

পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মো. খোরশেদ আলম জানান, তাঁদের বিভাগে সাতটি ব্যাচে চার শতাধিক শিক্ষার্থী রয়েছেন, কিন্তু শিক্ষক মাত্র চারজন। এত শিক্ষার্থীর পাঠদান, থিসিস তত্ত্বাবধান ও অন্যান্য একাডেমিক কাজ করতে গিয়ে তাঁরা হিমশিম খাচ্ছেন। রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী তরিকুল ইসলাম জানান, তাঁদের বিভাগে মাত্র পাঁচজন শিক্ষক পাঁচটি ব্যাচের দায়িত্ব পালন করছেন। এর ফলে সেশনজট ইতিমধ্যে তিন থেকে পাঁচ মাস দীর্ঘায়িত হয়েছে; ভবিষ্যতে আরও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

আবাসিক সুবিধার ক্ষেত্রেও সংকট প্রকট। চারটি হলে—শেরেবাংলা, বিজয়-২৪, সুফিয়া কামাল ও রাবেয়া বসরী—সর্বোচ্চ প্রায় ১ হাজার ৮০০ শিক্ষার্থীর থাকার সুযোগ রয়েছে। অর্থাৎ মোট শিক্ষার্থীর মাত্র ১৮ শতাংশ আবাসিক সুবিধা পাচ্ছেন। বাকি ৮২ শতাংশকে ক্যাম্পাসের বাইরে মেস বা ভাড়া বাসায় থাকতে হচ্ছে। উপমা দত্ত নামের এক শিক্ষার্থী জানান, বাইরে থাকলে মাসিক খরচ সর্বনিম্ন আট হাজার টাকা, যেখানে হলে সর্বোচ্চ চার হাজার টাকা লাগত। পাশাপাশি নিরাপত্তা ও যাতায়াত নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে।

কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের রিডিং রুমে আসনের সংখ্যাও অপ্রতুল। সেখানে মাত্র ১৩০টি আসন রয়েছে; অর্থাৎ গড়ে ৭৮ শিক্ষার্থীর জন্য একটি আসন। পরীক্ষার সময় চাপ আরও বেড়ে যায়; অনেক শিক্ষার্থীকে আসন না পেয়ে ফিরে যেতে হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি ভবনেই গ্রন্থাগার, পরীক্ষা নিয়ন্ত্রকের দপ্তর, মেডিকেল সেন্টার ও সমাজকর্ম বিভাগের কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে; ফলে একই অবকাঠামোর ওপর বহুমুখী চাপ পড়ছে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক মামুন অর রশিদ প্রথম আলোকে বলেন, শিক্ষক-সংকট তাঁদের বেশ ভোগাচ্ছে। এ বিষয়ে ইউজিসিকে জানিয়ে আবেদন করা হয়েছে এবং সংস্থাটি কিছু শিক্ষক নিয়োগের ব্যাপারে আশ্বস্ত করেছে। অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা দূর করতে একাডেমিক ভবনের জন্য একটি ছোট প্রকল্প প্রস্তাব শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে জমা দেওয়া হয়েছে। নতুন অর্থবছরে এটি অনুমোদন পেলে কিছুটা স্বস্তি মিলবে। এ ছাড়া নতুন হল ও অন্যান্য অবকাঠামোর জন্য একটি বড় প্রকল্প প্রস্তাব তৈরির কাজ চলছে; যদিও এটি বাস্তবায়নে সময় লাগবে।