দুপুরের খাবার শেষে চোখ যখন ভার হয়ে আসে, তখন অনেকেই ১০-১৫ মিনিট শুয়ে পড়ার কথা ভাবেন। কিন্তু সমস্যা শুরু হয় ঘুম থেকে উঠার পরেই—মাথা ঝিমঝিম করা, মনোযোগের অভাব, অকারণে বিরক্তি আর শরীরে এক ধরনের ক্লান্তি। এমন অনুভূতিকে কেন ব্যাখ্যা করলেন স্ট্যানফোর্ড ইউনিভার্সিটির স্লিপ মেডিসিন বিভাগের ক্লিনিকাল প্রফেসর রাফায়েল পেলায়ো। মার্কিন দৈনিক ওয়াশিংটন পোস্টে প্রকাশিত তাঁর বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, এই সমস্যার পেছনে প্রধানত দুটি কারণ দায়ী—ঘুম খুব কম হওয়া অথবা এত বেশি ঘুমানো যে গভীর ঘুম থেকে জেগে উঠতে শরীর অস্বীকার করে।

ঘুমের প্রকৃতি বোঝার জন্য প্রথমে জানতে হবে, আমাদের রাতের ঘুম মূলত দুই ভাগে বিভক্ত—র্যাপিড আই মুভমেন্ট (REM) বা স্বপ্নের স্তর এবং নন-র্যাপিড আই মুভমেন্ট (NREM) বা স্বপ্নহীন স্তর। এই NREM স্তরটি আবার হালকা, মাঝারি ও গভীর—তিনটি ধাপে ভাগ। ঘুম শুরু হলে প্রথমে হালকা ঘুম, তারপর ধীরে ধীরে গভীর ঘুমে প্রবেশ করে শরীর। সাধারণত ঘুমিয়ে পড়ার এক থেকে দুই ঘণ্টার মধ্যে প্রথম REM স্তর আসে। ড. পেলায়োর মতে, দুপুরে দেড় ঘণ্টার বেশি ঘুমালে শরীর তখন গভীর NREM স্তরে ডুবে থাকে। সেখান থেকে হঠাৎ জেগে উঠলে মস্তিষ্ক ও শরীর সেই পরিবর্তন মেনে নিতে পারে না—এই অবস্থাকে বিজ্ঞানের ভাষায় বলা হয় 'স্লিপ ইনারশিয়া'। অনেক সময় একে 'স্লিপ ড্রাঙ্কেননেস' বা ঘুমের ঘোরে মাতাল অবস্থাও বলা হয়, যার ফলে শরীর ব্যথা করে, মাথা কাজ করে না এবং বিভ্রান্ত লাগে।

তবে এই সমস্যা কি শুধু দুপুরের ঘুমেই সীমাবদ্ধ? ড. পেলায়ো বলছেন, দিন হোক বা রাত—ঘুম থেকে ওঠার পর যদি নিয়মিত খিটখিটে মেজাজ থাকে, তবে বুঝতে হবে শরীরে মারাত্মক ঘুমের অভাব রয়েছে। চিকিৎসাবিজ্ঞানে যাকে 'স্লিপ ডিপ্রাইভেশন' বলা হয়। পর্যাপ্ত ঘুম না হলে স্বাভাবিকভাবেই মানুষ চঞ্চল ও অমনোযোগী হয়ে পড়ে। এই সমস্যার সমাধান হলো ঘুমের পরিমাণ ও মান দুটোই বাড়ানো। তবে অনেক সময় আমরা নিজের অজান্তেই ঘুম নষ্ট করি—অতিরিক্ত চা-কফি, অ্যালকোহল, শোয়ার আগে মোবাইল ব্যবহার, খুব গরম বা ঠান্ডা ঘর কিংবা অসমান বিছানা—এসবই ঘুমের মান নষ্ট করার জন্য যথেষ্ট। কিন্তু আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় প্রায়ই উপেক্ষিত থেকে যায়—ঘুমাতে যাওয়ার সময় মানসিক অবস্থা। বিছানায় গেলে যদি বিরক্তি লাগে বা রাতের পরিকল্পনা নিয়ে দুশ্চিন্তা কাজ করে, তবে সেই মানসিক চাপও ঘুমের গভীরতাকে প্রভাবিত করে। আর যদি এসব সত্ত্বেও ঘুম থেকে ওঠার পর মাথা ভার থাকে ও কাজে মনোযোগ না আসে, তাহলে স্লিপ অ্যাপনিয়ার মতো শারীরিক সমস্যাও থাকতে পারে। সেক্ষেত্রে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।

দুপুরের ঘুমের জন্য সবচেয়ে উপযুক্ত সময় হলো খাবার পরপরই, কারণ তখন শরীরের জৈবিক ঘড়ির কারণে স্বাভাবিকভাবেই ঝিমুনি আসে। ড. পেলায়ো এই ছোট ঘুমটাকে বিকেলের হালকা নাশতার সঙ্গে তুলনা করেছেন। যেমন নাশতা কম হলে খিদে থাকে, আবার বেশি খেলে রাতের খাবারে অনীহা—দুপুরের ঘুমও ঠিক তেমনই ভারসাম্যপূর্ণ হওয়া দরকার। একজন প্রাপ্তবয়স্কের জন্য আদর্শ সময় হলো ২০ থেকে ৪০ মিনিট। এই সময় মস্তিষ্ক রিচার্জ হওয়ার জন্য যথেষ্ট, তবে এর বেশি ঘুমালে রাতের ঘুম নষ্ট হতে বাধ্য। তাই অ্যালার্ম সেট করে ঘুমানোই নিরাপদ।

যারা কফি ছাড়া ঘুমাতেই পারেন না, তাদের জন্য রয়েছে 'কফি ন্যাপ' বা 'ন্যাপুচিনো' নামক কৌশল—ঘুমানোর ঠিক আগে এক কাপ কফি খেয়ে নেওয়া, যাতে ক্যাফেইন কাজ শুরু করার আগেই ঘুমিয়ে পড়া যায় এবং ২০ মিনিট পর জেগে উঠে চাঙ্গা লাগে। তবে এই পদ্ধতি তখনই কার্যকর, যদি ঘুম তাৎক্ষণিক আসে। সবচেয়ে ভালো উপায় হলো, রাতে যে ঘরে ঘুমান, দুপুরের ঘুমও সেখানেই অন্ধকার পরিবেশে বা চোখে মাস্ক পরে নেওয়া। এতে শরীর বুঝতে পারে এটি বিশ্রামের সময় এবং সেই অনুযায়ী প্রতিক্রিয়া জানায়। নিয়ম মেনে ঘুমালে বিকেলের বিষণ্ণতা ও খিটখিটে ভাব অনেকটাই কমানো সম্ভব।