নাটোর শহরের রথবাড়ি রাজাপুর মহল্লার বাসিন্দা ইউনুস আলী (২৮), যার জীবন এক চরম বিপর্যয়ের গল্প থেকে ঘুরে দাঁড়িয়েছে সাফল্যের শিখরে। মাত্র আট বছর বয়সে এক অসুস্থতার পর তিনি তার দুই চোখের দৃষ্টিশক্তি এবং দুই পায়ের ক্ষমতা হারিয়ে ফেলেন। তৃতীয় শ্রেণিতে পড়ার সময় হঠাৎ জ্বর ও পেটব্যথার কারণে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হন তিনি, কিন্তু সঠিক চিকিৎসার অভাবে শারীরিক এই স্থায়ী অক্ষমতা তৈরি হয়। শৈশবের স্বাভাবিক খেলাধুলা ও পড়াশোনার স্বপ্নগুলো মুহূর্তেই ভেঙে পড়ে। পারিবারিক সংকটের মুখে যখন বাবা অন্যত্র সংসার পাতেন, তখন বড় সন্তান হিসেবে পুরো পরিবারের ভার ইউনুসের কাঁধে চলে আসে।

শুরুতে সরকারি প্রতিবন্ধী ভাতা হিসেবে মাসিক ১ হাজার ৫০০ টাকা পেতেন তিনি, যা দিয়ে পরিবারের সদস্যদের একবেলার খাবারের খরচ মেটানোই ছিল দুঃসাধ্য। ভিক্ষাবৃত্তির পথে না গিয়ে তিনি বেছে নেন ব্যবসার পথ। এক খামারের পরামর্শে স্বল্প পুঁজি দিয়ে ৮০টি কোয়েল পাখি কিনে ব্যবসা শুরু করেন। তাঁর সততা ও নিষ্ঠায় খুশি হয়ে খামারি তাঁকে অগ্রিম পাখি দেওয়ার সুযোগ করে দেন। এভাবে ধীরে ধীরে তিনি গড়ে তোলেন নিজস্ব 'ইউনুস কোয়েল ফার্ম'। বর্তমানে তিনি শহরের নিচাবাজারে এবং প্রতি রোববার তেবাড়িয়া হাটে পাখি বিক্রি করেন। এই আয় থেকেই তিনি তাঁর বৃদ্ধ মা এবং বিবাহবিচ্ছেদ হওয়া বোনের সংসার পরিচালনা করছেন।

তবে এই পথচলা সহজ ছিল না। দৃষ্টিহীন এবং অচল হওয়ায় হিসাব-নিকাশ রাখা, ক্রেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ এবং যাতায়াতের ক্ষেত্রে তাঁকে চরম প্রতিকূলতার সম্মুখীন হতে হয়। এমনকি বাজারে নির্ধারিত দোকান না থাকায় মাছ বিক্রেতাদের ভিড়ের মাঝে তাঁকে বসতে হয়। সবচেয়ে কষ্টের অভিজ্ঞতা ছিল কিছু অসাধু ক্রেতার প্রতারণা; অনেকে তাঁর অন্ধত্বের সুযোগ নিয়ে জাল টাকা বা কম টাকা দিয়ে বেশি দেওয়ার দাবি করতেন। এছাড়া গত শীতকালে এক দুর্ঘটনায় তাঁর এক হাজার পাখির সবকটি মারা যাওয়ায় তিনি দিশেহারা হয়ে পড়েছিলেন। সেই কঠিন সময়ে নাটোর পৌরসভার সাবেক মেয়র এমদাদুল হক আল মামুন তাঁকে ৫০ হাজার টাকা দিয়ে পুনরায় ব্যবসা শুরু করতে সাহায্য করেন।

ইউনুস আলীর এই লড়াইয়ে তাঁর সবচেয়ে বড় শক্তি হয়ে পাশে আছেন মা রাজিয়া বেগম এবং বোন রিনি খাতুন। রিনি জানান, স্বামী তালাক দেওয়ার পর ভাই ইউনুসই তাঁকে আশ্রয় ও ভরণপোষণ দিয়েছেন। অন্যদিকে মা রাজিয়া বেগম তাঁর ছেলের পরিশ্রমের কথা উল্লেখ করে গর্ব প্রকাশ করেন। ক্রেতাদের মতে, ইউনুস একজন অত্যন্ত সৎ ব্যবসায়ী, যিনি নিখুঁতভাবে পাখি জবাই ও পরিষ্কার করে স্বল্প লাভে বিক্রি করেন।

বর্তমানে ইউনুসের বড় কোনো আর্থিক সহায়তার প্রয়োজন নেই, তবে তিনি দুটি বিশেষ অনুরোধ জানিয়েছেন। তিনি চান যাতায়াতের জন্য একটি উপযুক্ত যানবাহন এবং বাজারে একটি স্থায়ী দোকানের জায়গা। তাঁর মতে, নির্ধারিত জায়গা থাকলে তাঁর ব্যবসার প্রসার ঘটবে এবং ক্রেতাদের সাথে আরও সহজভাবে লেনদেন করা সম্ভব হবে।