অনেকেই রাতে বিছানায় শুয়ে স্মার্টফোনে এক খবর থেকে অন্য খবরে বা সোশ্যাল মিডিয়ার ভিডিওতে ডুবে থাকেন এবং কখন যে রাত গভীর হয়, তা টের পান না। বিশেষ করে নেতিবাচক বা দুঃসংবাদযুক্ত পোস্টগুলো অনবরত স্ক্রল করে যাওয়ার এই অভ্যাসকেই বলা হয় ‘ডুমস্ক্রলিং’। সাধারণত মানুষের সহজাত প্রবৃত্তির কারণে মস্তিষ্ক বিপদের সংবাদের প্রতি বেশি সংবেদনশীল হয়, যার ফলে খারাপ খবরের বিস্তারিত জানার কৌতূহল তৈরি হয়। এর সাথে সোশ্যাল মিডিয়ার অ্যালগরিদম ব্যবহারকারীকে দীর্ঘক্ষণ আটকে রাখতে সাহায্য করে, যা শেষ পর্যন্ত শরীর ও মনের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, দিনভর তথ্যের চাপে থাকা মস্তিষ্কের বিশ্রামের জন্য নির্দিষ্ট সময়ের প্রয়োজন। কিন্তু ঘুমের আগমুহূর্ত পর্যন্ত ফোনের পর্দায় চোখ আটকে থাকলে মস্তিষ্ক নিজেকে ‘রিচার্জ’ করার সুযোগ পায় না। ফলে পরদিন ক্লান্তি, খিটখিটে মেজাজ, স্মৃতিভ্রম কিংবা মনোযোগের অভাব দেখা দিতে পারে। এছাড়া ফোনের পর্দা থেকে নির্গত নীল আলো শরীরে মেলাটোনিন নামক ঘুম-সহায়ক হরমোনের নিঃসরণ কমিয়ে দেয়, যা ঘুমের গুণমান নষ্ট করে এবং ঘুমের সময় পিছিয়ে দেয়। ঠিকমতো ঘুম না হলে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা এবং সামগ্রিক চিন্তাশক্তি হ্রাস পায়, যা অনেক সময় 'ব্রেন ফগ'-এর মতো পরিস্থিতির সৃষ্টি করে।

রাতে ডুমস্ক্রলিং করার ফলে একটি বিপজ্জনক দুষ্টচক্র তৈরি হতে পারে। নেতিবাচক কনটেন্ট মস্তিষ্ককে আরও সতর্ক ও সক্রিয় করে তোলে, যা নীল আলোর প্রভাবে ঘুমের পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়। পর্যাপ্ত ঘুমের অভাবে পরদিন মানুষ মানসিকভাবে ক্লান্ত বোধ করে এবং সেই অবসাদ কাটাতে পুনরায় ফোনের স্ক্রিনে ডুবে থাকার সহজ পথ বেছে নেয়। এর ফলে নিয়মিত মনোযোগ কমে যাওয়া এবং ছোটখাটো বিষয় ভুলে যাওয়ার প্রবণতা তৈরি হয়।

তবে প্রযুক্তি ব্যবহার করাই ক্ষতিকর নয়, বরং সমস্যা হলো এর ‘অভ্যাসগত’ ব্যবহার। এই সমস্যা থেকে মুক্তি পেতে বিশেষজ্ঞরা কিছু কার্যকরী পদক্ষেপ গ্রহণের পরামর্শ দিয়েছেন। যেমন— খবরের জন্য দিনের একটি নির্দিষ্ট সময় নির্ধারণ করা, যাতে সারাদিন বারবার ফোন হাতে নিতে না হয়। ঘুমানোর অন্তত এক ঘণ্টা আগে ডিজিটাল ডিভাইসগুলো সরিয়ে রাখা এবং অপ্রয়োজনীয় নোটিফিকেশন বন্ধ করে দেওয়া, যাতে বারবার স্ক্রলিংয়ের তাগিদ তৈরি না হয়।

যদি ডুমস্ক্রলিংয়ের পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদী উদ্বেগ, মাথাব্যথা, ঘুমের গুরুতর সমস্যা বা স্মৃতিশক্তি কমে যাওয়ার লক্ষণ দেখা দেয় এবং তা দৈনন্দিন জীবনে প্রভাব ফেলে, তবে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি। সুস্থ থাকার জন্য মস্তিষ্ককে নিরবতা ও নিরবচ্ছিন্ন ঘুমের সুযোগ দেওয়া প্রয়োজন। রাতে ফোন ব্যবহারের বদলে বই পড়া বা চুপচাপ বিশ্রাম নেওয়া হতে পারে দিনের সবচেয়ে ইতিবাচক সমাপ্তি।