নদীর স্রোতের মতোই বয়ে চলা মানুষের জীবন—দুঃখ, ক্ষুধা আর বঞ্চনার গল্প নিয়ে। সেই গল্পই নিজের গানে ধারণ করেছেন ভূপেন হাজারিকা। তাঁর জন্মের শতবর্ষ পূর্ণ হলো সম্প্রতি। ১৯২৬ সালের ৮ সেপ্টেম্বর আসামের সাদিয়ায় জন্ম নেওয়া এই শিল্পী শুধু গায়ক বা সুরকার ছিলেন না; ছিলেন সমাজের আয়না, মানুষের কণ্ঠস্বর।
বেনারস হিন্দু বিশ্ববিদ্যালয় ও যুক্তরাষ্ট্রের কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করলেও তাঁর আসল পাঠ্যবই ছিল পৃথিবী—মানুষের সংগ্রাম, জীবনের রূঢ় বাস্তবতা। দেশে ফিরে তিনি ভারতীয় গণনাট্য সংঘের (আইপিটিএ) সঙ্গে যুক্ত হন। এতে তাঁর শিল্পচর্চা আরও প্রত্যক্ষভাবে গণমুখী সাংস্কৃতিক আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত হয়। স্থানীয় বরগীত, গোয়ালপাড়ার গান, চা–মজদুরের গান, বিহুগীত—শৈশবেই এসবের সঙ্গে পরিচিত হন তিনি। গীতিকার আনন্দীরাম দাস, পার্বতী প্রসাদ বড়ুয়া ও কমলানন্দ ভট্টাচার্যের মাধ্যমে গ্রামীণ সংস্কৃতির প্রভাব তাঁর মনে গভীরভাবে পড়ে। পরবর্তীকালে সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব জ্যোতিপ্রসাদ এবং হিন্দুস্তানি ক্ল্যাসিক্যাল সংগীতের ওস্তাদ বিষ্ণুপ্রসাদ রাভার হাত ধরেই সংগীতে তাঁর পথচলা শুরু।
কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় কৃষ্ণাঙ্গ শিল্পী ও নাগরিক অধিকার আন্দোলনের কণ্ঠ পল রোবসনের সঙ্গে তাঁর পরিচয় হয়। রোবসনের কাছ থেকে তিনি গভীরভাবে উপলব্ধি করেন—গান মানুষের কষ্টের কথা বলতে পারে, বৈষম্যের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে পারে, ক্ষমতাকে প্রশ্ন করতে পারে। রোবসনের বিখ্যাত ‘Ol’ Man River’-এ মিসিসিপি নদীর সঙ্গে জড়িয়ে আছে কৃষ্ণাঙ্গ মানুষের শ্রম ও বেদনার ইতিহাস। ভূপেন সেই গান অনুবাদ করেননি, বরং এর অন্তর্নিহিত প্রতিবাদ ও নদীর প্রতীকী ভাবকে ভারতীয় বাস্তবতায় নতুন করে রূপ দিয়েছেন। মিসিসিপির দীর্ঘশ্বাস মিশে গেছে ব্রহ্মপুত্রের জলে, গঙ্গার স্রোতে। জন্ম নিয়েছে ‘বিস্তীর্ণ দুপারের, অসংখ্য মানুষের হাহাকার শুনেও…’—এমন গান।
ভূপেনের গানে নদী যেমন আছে, তেমনি আছে নদীপাড়ের ক্ষুধার্ত মানুষ, প্রেম আর ‘প্রেমহীন’ সমাজের বিরুদ্ধে তীক্ষ্ণ উচ্চারণ। তিনি গানকে মানুষের জীবনসংগ্রাম, সাম্য ও মানবিকতার ভাষায় পরিণত করেছেন। তাঁর গান শোনার পর শ্রোতা নিজের অজান্তেই সমাজের আয়নার সামনে দাঁড়ায়, ভাঙাচোরা প্রতিকৃতি দেখে চমকে ওঠে। গান যখন মানুষের পক্ষে দাঁড়ায়, তখন তা শুধু আনন্দ-বিনোদন থাকে না; হয়ে ওঠে গভীরতর ভাষা। ভূপেন সেই আনন্দকে অস্বীকার করেননি, তবে গানকে দিয়েছেন জীবনের রূঢ় বাস্তবতার সঙ্গে যুক্ত এক শক্তিশালী মাত্রা।
শ্রমিকের ঘামে সভ্যতা নির্মাণের কাহিনি, যে কৃষক খাদ্য উৎপাদন করে তার নিজের ঘরে তিন বেলা হাঁড়ি চড়ে না—এসব বিস্মৃত মানুষের কথাই বারবার উঠে এসেছে তাঁর গানে। তিনি করুণার চোখে নয়, মর্যাদার সঙ্গে তাঁদের স্মরণ করেছেন। তাঁর গানের অন্তর্লীন বক্তব্য—মানুষের পাশে দাঁড়ানো দয়া নয়, দায়িত্ব। একজন মানুষের অধিকার কেন আরেকজনের দয়ার ওপর নির্ভর করবে? এমন প্রশ্নই তিনি ছুড়ে দিয়েছেন।
অনেক ‘রাজনৈতিক গান’ কালের গর্ভে হারিয়ে যায়, কিন্তু ভূপেনের গান টিকে আছে। কেননা তাঁর গান শোষণ, বৈষম্য, নিপীড়ন ও সামাজিক অবিচারের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছে। তবে তাঁকে শুধু প্রতিবাদী গায়ক বললে তাঁর শিল্পের ব্যাপ্তি ধরা পড়ে না। প্রেম-বিচ্ছেদও তাঁর গানে স্থান পেয়েছে। কখনো গান অস্ত্র হয়ে ওঠে, যদি তা মানুষের চিন্তা বদলায়, প্রশ্ন করতে শেখায়। ভূপেনের গান সেই অর্থে উদাসীনতা, ভীতি ও বিভেদের বিরুদ্ধে অস্ত্র। তিনি শ্রোতাকে বলেন, শুধু দর্শক হয়ে থেকো না; পৃথিবীতে যা ঘটছে, তা তোমারও বিষয়—কারণ তুমি মানুষ।
এক শতাব্দীতে পৃথিবীর অনেক কিছু বদলেছে—স্মার্টফোন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, তৎক্ষণাৎ যোগাযোগ। কিন্তু মানুষের মৌলিক অধিকারের খামতি কতটা পূরণ হয়েছে? যুদ্ধ-সংঘাত, জাতি-ধর্মের নামে হত্যা, শ্রমের ন্যায্য মূল্যের প্রশ্ন—সবই আগের মতো আছে। তাই ভূপেনের গান পুরোনো হয়নি; নতুন পৃথিবীতে তাঁর প্রশ্নগুলো আরও প্রাসঙ্গিক। ক্ষমতাবানের মুখ বদলায়, শোষকের পোশাক বদলায়; কিন্তু শোষণ থেকে যায়। ভূপেন হাজারিকা তাই বারবার বর্তমানের হয়ে ওঠেন।
হেমাঙ্গ বিশ্বাস, সলিল চৌধুরী, উডি গাথরি বা পিট সিগারের মতো গণমুখী শিল্পীদের পরম্পরার সঙ্গে তাঁর গানের গভীর আত্মীয়তা আছে। পরবর্তীকালে প্রতুল মুখোপাধ্যায়, কবীর সুমন ও নচিকেতার গানেও মানুষের জীবন ও সামাজিক অসংগতির স্বর শোনা যায়। ভূপেন হাজারিকা ভারতের সর্বোচ্চ বেসামরিক পুরস্কার ‘ভারতরত্ন’ মরণোত্তর (২০১৯) পেয়েছেন। তবে এটাই তাঁর শেষ পরিচয় নয়। তিনি গানকে জীবনের কাছে নিয়ে গিয়েছিলেন এবং জীবনকে ফিরিয়ে দিয়েছিলেন গানের মধ্যে। যত দিন একজন মানুষ আরেকজনের দিকে হাত বাড়াবে, অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রশ্ন তুলবে, তত দিন শোনা যাবে তাঁর কণ্ঠ—‘বিস্তীর্ণ দুপারের…’ মানুষের পক্ষে, মানুষের জন্য।



