দীর্ঘদিন পর্দায় অনুপস্থিত থাকার পর নেটফ্লিক্সের নতুন রোমান্টিক সিরিজ ‘মুসাফির ক্যাফে’ দিয়ে দর্শকের সামনে ফিরেছেন অভিনেত্রী মহিমা মকওয়ানা। রুচির অরুণ পরিচালিত এই সিরিজে তাঁর সহশিল্পী হিসেবে রয়েছেন বিক্রান্ত ম্যাসি ও বেদিকা পিন্টো। সম্প্রতি মুম্বাইয়ের বান্দ্রা-কুর্লা কমপ্লেক্সে নেটফ্লিক্স কার্যালয়ে প্রথম আলোর সঙ্গে এক আড্ডায় নিজের ক্যারিয়ার, অপেক্ষার সময় এবং ব্যক্তিগত জীবনের নানা প্রসঙ্গে খোলামেলা কথা বলেছেন তিনি।
কাজের ফাঁকে এতদিন কোথায় ছিলেন—এই প্রশ্নে মহিমা জানান, তিনি কোথাও হারিয়ে যাননি, বরং সঠিক চিত্রনাট্যের খোঁজেই অপেক্ষায় ছিলেন। তাঁর ভাষ্য, অভিনেতা হিসেবে কাজ করা ছাড়া অনেক কিছুই নিয়ন্ত্রণে থাকে না; কোনো প্রকল্প কবে শুরু বা মুক্তি পাবে তা নির্ভর করে প্রযোজকসহ নানা বিষয়ের ওপর। ‘শোটাইম’, ‘অন্তিম: দ্য ফাইনাল ট্রুথ’ বা ‘তুমসে না হো পায়েগা’র মতো কাজের পর নতুনত্বের খোঁজে ছিলেন তিনি। সেদিক থেকে ‘মুসাফির ক্যাফে’ তাঁর জন্য সঠিক সুযোগ ছিল বলেই মনে করেন এই অভিনেত্রী। তবে এই অপেক্ষার সময়টা যে মোটেও সহজ ছিল না, তাও স্বীকার করেন তিনি। সেটে থাকাকে তিনি সবচেয়ে স্বস্তির জায়গা বললেও, কাজের বাইরের সময়টাকে কঠিন বলেই বর্ণনা করেন। তাঁর মতে, নিজে এই পেশা বেছে নেওয়ায় কোনো অভিযোগের অবকাশ নেই।
গত দুই বছর কাজের পাশাপাশি নিজের জন্যও সময় দিয়েছেন মহিমা। ঘুরে বেড়ানো আর নিজের সঙ্গে সময় কাটানো তাঁকে নিজেকে আরও ভালোভাবে চিনতে সাহায্য করেছে বলে জানান তিনি। এ সময়ে হতাশা এসেছে, তবে বেশিরভাগ বিষয় যে কারও নিয়ন্ত্রণে থাকে না—এই উপলব্ধি থেকেই তিনি শান্তি খুঁজে নিয়েছেন।
টেলিভিশন দিয়েই তাঁর অভিনয়জীবনের শুরু; সেই মাধ্যমের প্রতি তাই বিশেষ কৃতজ্ঞতা রয়েছে। মাত্র ১২ বছর বয়সে ‘সাপনে সুহানে লড়কপন কে’ ধারাবাহিকে ‘রচনা’ চরিত্রে অভিনয় করে ঘরে ঘরে পরিচিত হয়েছিলেন তিনি। আজ প্রায় ২৭ বছর বয়সে দাঁড়িয়েও দর্শকের ভালোবাসা তাঁকে আপ্লুত করে। টেলিভিশনের প্রভাবকে অনেকেই ছোট করে দেখেন বলে মন্তব্য করেন মহিমা, কিন্তু ১৫ বছর পরও মানুষের ভালোবাসা যে তাঁর পরিচিতির ভিত্তি তৈরি করেছে, তা তিনি গভীরভাবে অনুভব করেন।
সিরিজের সেটে দুই অভিনেত্রীর মধ্যে প্রতিযোগিতা বা নিরাপত্তাহীনতার গল্প প্রায়ই শোনা যায়—এই প্রসঙ্গে বেদিকা পিন্টোর সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক নিয়ে প্রশ্ন করা হলে মহিমা বলেন, এটা দুই নারী বা দুই পুরুষের বিষয় নয়, বরং একজন মানুষ কেমন তা-ই আসল। দুই অভিনেত্রীর মধ্যে দারুণ বন্ধুত্ব হতে পারে, আবার পুরুষ সহশিল্পীর সঙ্গে না-ও মিলতে পারে। সব নির্ভর করে ব্যক্তির জীবনের পর্যায় এবং নিজের সম্পর্কে আত্মবিশ্বাসের ওপর। নিরাপত্তাহীনতা অনুভব করলে তা লুকিয়ে না রেখে খোলামেলা আলোচনার পক্ষে তিনি। ‘মুসাফির ক্যাফে’র সেটে বেদিকার সঙ্গে সময় কাটানো তাঁর জন্য দারুণ অভিজ্ঞতা ছিল বলে জানান তিনি।
প্রীতির চরিত্রে অভিনয়ের প্রস্তাব কীভাবে এল, তা-ও জানিয়েছেন মহিমা। তখন তিনি অন্য একটি ছবির শুটিংয়ে ব্যস্ত ছিলেন—গ্রামের পরিবেশে গ্রামের মেয়ের সাজে। সেই সময় করণ মালিকের ফোন পেয়ে তিনি অডিশনে যান। প্রথমে গল্প বা সহশিল্পীদের সম্পর্কে কিছুই জানানো হয়নি; অডিশনের পরই বিক্রান্ত ম্যাসির সঙ্গে কেমিস্ট্রি টেস্ট হয়। চিত্রনাট্য পড়ে তিনি বুঝতে পারেন, এ ধরনের কাজের জন্যই তিনি অপেক্ষা করছিলেন।
বিক্রান্ত ম্যাসির সঙ্গে তাঁর পরিচয় নতুন নয়; বালিকা বধূ সেটে মাত্র ৯-১০ বছর বয়সে প্রথম দেখা হয়েছিল। তখনকার একটি ঘটনা মনে করে বলেন, পরিচালক তাকে সবার সামনে বকেছিলেন এবং ‘ও অভিনয়ই পারে না’ বলে মন্তব্য করেছিলেন। কিন্তু সেই সেটে একজন আন্তরিক ছেলে ছিল—১৫ বছর পর সেই ছেলেটিই এখন তাঁর সহশিল্পী। এত বছর পর কাজ করে বিক্রান্তের সরলতা তাঁকে সবচেয়ে বেশি মুগ্ধ করেছে। ইন্ডাস্ট্রিতে প্রতিভাবান মানুষ অনেক থাকলেও সত্যিকারের ভালো মানুষ খুব কম—বিক্রান্ত তেমনই একজন, বলে মনে করেন মহিমা।
‘মুসাফির ক্যাফে’র প্রীতি চরিত্রের সঙ্গে নিজের কতটা মিল খুঁজে পান—এই প্রশ্নে মহিমা জানান, শুধু প্রীতি নয়, সিরিজের সুধা চরিত্রের সঙ্গেও তাঁর মিল রয়েছে। জীবনের প্রয়োজনের সঙ্গে মিল রেখেই যেন চরিত্রটি তিনি পেয়েছেন। তাঁর মতে, গল্পের সৌন্দর্যই হলো কোনো চরিত্র সম্পূর্ণ ঠিক বা ভুল নয়; মানুষ ভুল করে এবং সেই ভুল থেকেই শেখে।
ভালোবাসা, বিয়ে ও জীবনসঙ্গী প্রসঙ্গে নিজের ব্যক্তিগত বিশ্বাসের কথা অকপটে জানান মহিমা। তিনি বলেন, তিনি পুরোনো দিনের প্রেমে বিশ্বাস করেন; বিয়ে, প্রতিশ্রুতি এবং বন্ধুত্ব ও ভালোবাসার মিশেলে তৈরি সম্পর্ক তাঁর কাছেও আকর্ষণীয়। শেষ পর্যন্ত সবাই এমন কিছু বেছে নেয়, যা হৃদয় সত্যিই চায়। প্রতিটি মানুষেরই একটি ‘ঘর’ প্রয়োজন—সেটা নিজের ভেতরে বা অন্য কোনো মানুষের মধ্যে খুঁজে পাওয়া যায়।
‘মুসাফির ক্যাফে’ সিনেমা না হয়ে সিরিজ হওয়ায় গল্পটি আরও গভীরভাবে ফুটে উঠেছে বলে মনে করেন তিনি। সিরিজ চরিত্রগুলোর সঙ্গে দর্শকের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক তৈরি করতে পারে এবং বইয়ের পাঠকেরাও এতে নতুন কিছু খুঁজে পাবেন। তাঁর মতে, এই গল্পের জন্য সিরিজ ফরম্যাটই সবচেয়ে উপযুক্ত।
২০২১ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত ‘অন্তিম: দ্য ফাইনাল ট্রুথ’-এ সালমান খান ও আয়ুশ শর্মার সঙ্গে কাজ করেছিলেন মহিমা। সেই অভিজ্ঞতাকে তিনি ছেলেবেলার স্বপ্নপূরণের মতো বলে বর্ণনা করেন। ‘বিগ বস’–এ তাঁকে দেখে সালমান খান এক বছর পর অডিশনের জন্য ডাকেন; অডিশনের দুই দিনের মধ্যেই তিনি সিনেমার সেটে চলে যান। মায়ের স্বপ্ন ছিল বড় পর্দায় তাঁকে দেখা—‘অন্তিম’ সেই স্বপ্নই পূরণ করেছিল।
ভবিষ্যতে বড় বাণিজ্যিক ছবিতে কাজ করার ইচ্ছা থাকলেও টেলিভিশনে ফেরার বিষয়ে এখন তাঁর চিন্তাভাবনা বদলেছে। টেলিভিশন তাঁকে ঘরে ঘরে পৌঁছে দিয়েছে, কিন্তু এখন নতুন গল্প ও চরিত্রের খোঁজে তিনি ওটিটি এবং সিনেমার দিকেই বেশি ঝুঁকছেন। ১২ বছর বয়সে যাত্রা শুরু করা এই অভিনেত্রী এখন আর কোনো নির্দিষ্ট মাধ্যমের গণ্ডিতে নিজেকে আটকে রাখতে চান না; তাঁর কাছে এখন গল্প ও চরিত্রই সবচেয়ে বড় বিবেচ্য।



