ক্রাউন সিমেন্টের ‘অভিজ্ঞতার আলো’ অনুষ্ঠানে অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের সাবেক শিল্পী রফিকুল আলম। কথাসাহিত্যিক ও সাংবাদিক আনিসুল হকের সঙ্গে দীর্ঘ আলাপে নিজের জন্ম, বেড়ে ওঠা, সংগীতচর্চা, মুক্তিযুদ্ধ এবং সংগীতজীবনের নানা অজানা দিক তুলে ধরেন তিনি।

১৯৪৮ সালের ৩১ ডিসেম্বর রাজশাহীর শিবগঞ্জ থানা এলাকার লক্ষ্মণপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন রফিকুল আলম। তাঁর বাবা মাহমুদ গিয়াসউদ্দিন আহমেদ ছিলেন ভূস্বামী, আর মা মমতাজ মহল। শৈশব কেটেছে রাজশাহী শহরের সাগরপাড়ায়। প্রথম স্কুল ভোলানাথ বিশ্বেশ্বর হিন্দু একাডেমি, যেখানে তখন মুসলিম ছাত্রদের প্রবেশ নিষিদ্ধ ছিল। তবে সংস্কৃতিমনা পরিবারের কারণে তাঁর বড় ভাইয়ের পরে তিনিও সেখানে পড়ার সুযোগ পান।

রফিকুল আলমের সংগীতের হাতেখড়ি ঘরেই। তাঁর বাবা ও চাচারা গান করতেন, বড় ভাই সারওয়ার জাহান ছিলেন জনপ্রিয় গায়ক। শাস্ত্রীয় সংগীতের তালিম নেন হরিপদ দাসের কাছে, যিনি লক্ষ্ণৌ মরিস কলেজ থেকে প্রশিক্ষিত ছিলেন। পরবর্তীকালে আব্দুল জব্বার খানের কাছেও শেখেন। রবীন্দ্রসংগীত দিয়েই তাঁর যাত্রা শুরু। ১৯৬৩ সালে ম্যাট্রিক পাস করে রাজশাহী কলেজে ভর্তি হন, পরে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতি বিভাগে ভর্তি হয়ে পরে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে অনার্স করেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংস্কৃতিক আন্দোলনে সক্রিয় ছিলেন তিনি।

১৯৬৩ সালে ম্যাট্রিক পরীক্ষার পর রাজশাহী বেতারে ‘স্টুডেন্টস ফোরাম’ অনুষ্ঠানে প্রথম গান করেন রফিকুল আলম। রবীন্দ্রসংগীত ‘যায় নিয়ে যায় আমায় আপন গানের টানে’ গেয়ে তিনি প্রশংসিত হন। পরে স্পেশাল অডিশনের মাধ্যমে বেতারে তালিকাভুক্ত হন। তবে তখন শুধু রবীন্দ্রসংগীত গাওয়ার অনুমতি ছিল। ১৯৬৯ সালের গণ-অভ্যুত্থানে রাজশাহীতে সক্রিয় অংশগ্রহণ ছিল তাঁর। মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে তিনি যোগ দেন স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে, যা তাঁর গানের ধারায় আমূল পরিবর্তন আনে। সেখানেই আধুনিক গান ও নোট স্ট্যাকাটোর ব্যবহার শেখেন।

স্বাধীনতার পর ঢাকায় চলে আসেন রফিকুল আলম। ড. মাজহারুল ইসলামের আমন্ত্রণে বাংলা একাডেমিতে গবেষণা প্রকল্পে যোগ দেন। ঢাকায় এসে রেডিও ও টেলিভিশনে গান করার সুযোগ পান। ‘তোমাকে যেন ভুলে না যাই’ গানটি লাকী আখান্দের সুরে রেকর্ড করার পর ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করেন। ১৯৭৪ সালে ঢাকা স্টেডিয়ামে আধুনিক গান গেয়ে প্রশংসা কুড়ান। সত্য সাহার সুরে ‘অতিথি’ ছবির গান ‘আমায় বন্ধু মাফ করে দাও’ গেয়ে চলচ্চিত্র জগতে প্রবেশ করেন। রাজ্জাকের লিপসিংয়ে গানটি দারুণ সাড়া ফেলে। পরবর্তী সময়ে ‘বৈশাখী মেঘের কাছে’, ‘কখনো আমার মাকে’, ‘এক হৃদয়হীনার কাছে’সহ বহু গান তাকে খ্যাতির শীর্ষে পৌঁছে দেয়।

১৯৭৮ সালে সংগীতশিল্পী আবিদা সুলতানার সঙ্গে তাঁর বিয়ে হয়। ঢাকা ক্লাবে অনুষ্ঠিত বিয়েতে সংগীতাঙ্গনের সবাই উপস্থিত ছিলেন। তাঁদের এক ছেলে ফারশিদ আলম, যিনি প্রগ্রেসিভ রক ব্যান্ডের গায়ক। রফিকুল আলম বলেন, স্ত্রী তাঁর গানের উচ্চারণ শুদ্ধ করতে সবসময় সহায়তা করেছেন।

দীর্ঘ ক্যারিয়ারে রফিকুল আলম বাংলা একাডেমি, বিজেএমসি, বিসিকসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে কাজ করেছেন। হল্যান্ডের ডেলফ্ট ইউনিভার্সিটি থেকে পোস্ট-গ্র্যাজুয়েশন করেছেন। বর্তমানে তিনি ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে নতুন গান প্রকাশ করছেন। গত এক মাসে চারটি নতুন গান করেছেন।

বাংলাদেশের সংগীতাঙ্গনের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে তিনি আশাবাদী। বলেন, ‘এ দেশের মানুষ কখনো ভুল করে না। রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে ভুল হতে পারে, কিন্তু জনগণ সচেতন। গান-কবিতা এ দেশের মানুষের রক্তে মিশে আছে, সাময়িক কোনো সমস্যা তা মুছে দিতে পারবে না।’