রাজধানীর মিরপুরের শাহআলী মাজার এলাকায় প্রতি শুক্রবার অনুষ্ঠিত পোষা প্রাণীর হাটে সম্প্রতি এক জোড়া বিরল টিয়া পাখির দাম ২ লাখ ৩০ হাজার টাকা চাওয়া হয়েছে। পাখি দুটির নাম 'রিংনেক ভায়োলেট'। দেখতে সাধারণ সবুজ টিয়ার মতোই হলেও এদের পালকের বেগুনি আভা এবং বিশেষ রঙের কারণে বাজারে এদের ব্যাপক চাহিদা ও উচ্চমূল্য। কেবল মিরপুর নয়, কাটাবনের পোষা প্রাণীর বাজারেও এক জোড়া ভায়োলেট রিংনেকের দাম দেড় থেকে দুই লাখ টাকা পর্যন্ত পাওয়া গেছে। ব্যবসায়ীদের মতে, এর মধ্যে 'অপালাইন' ধরনের কিছু বিরল প্রজাতির দাম বাংলাদেশে চার থেকে সাত লাখ টাকা পর্যন্ত হতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই অস্বাভাবিক দামের পেছনে প্রধান কারণ হলো জিনগত বৈচিত্র্য, বিশেষ প্রজনন পদ্ধতি এবং বাজারে সীমিত সরবরাহ। পোষা পাখি ও বন্য প্রাণী প্রজনন বিশেষজ্ঞ আ ন ম আমিনুর রহমান জানান, রিংনেক ভায়োলেট মূলত রিংনেক প্যারাকিটের একটি মিউট্যান্ট সংস্করণ। প্রকৃতিতে বিদ্যমান জিনগত বৈচিত্র্য কাজে লাগিয়ে প্রজননকারীরা বিশেষ রঙের বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন পাখি বেছে নিয়ে প্রজন্মের পর প্রজন্ম প্রজনন করান। এর ফলে লুটিনো, ব্লু ভায়োলেট, অ্যালবিনো এবং বাটার কাপের মতো নানা রঙের রিংনেক তৈরি হয়। তবে প্রতিবার প্রজননে নির্দিষ্ট রঙের বাচ্চা পাওয়া নিশ্চিত হয় না, যা এর দুষ্প্রাপ্যতা বাড়িয়ে দেয়।
পালকের রঙের বৈচিত্র্য নিয়ে ২০২৫ সালে স্প্রিঙ্গার নেচারের কমিউনিকেশনস বায়োলজি সাময়িকীতে একটি আন্তর্জাতিক গবেষণা প্রকাশিত হয়েছে। ইসরায়েলের বেন-গুরিয়ন ইউনিভার্সিটি এবং চেক প্রজাতন্ত্রের চার্লস ইউনিভার্সিটির গবেষকদের নেতৃত্বে পরিচালিত ওই গবেষণায় বলা হয়েছে, টিয়ার পালকে লাল, হলুদ ও গোলাপি রং তৈরিতে 'পিকেএস' নামক একটি এনজাইম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এই এনজাইমের কার্যক্রমে জিনগত পরিবর্তন ঘটলে পালকের রঙে ভিন্নতা দেখা দেয়।
পাখিটির দাম বাড়ার আরেকটি বড় কারণ হলো আমদানির সীমাবদ্ধতা। বন অধিদপ্তরের বন সংরক্ষক মো. ছানাউল্যা পাটওয়ারী জানিয়েছেন, রিংনেক ভায়োলেটের মতো মিউট্যান্ট পাখি পোষা অবৈধ নয়। তবে বনের সবুজ রিংনেক এবং খাঁচায় পালিত এই বিশেষ রঙের পাখিদের বৈজ্ঞানিক নাম একই হওয়ায় বর্তমানে এগুলো আমদানির অনুমতি দেওয়া হচ্ছে না। তবে বিষয়টি বৈজ্ঞানিক কমিটিতে আলোচনার পর আমদানির সুযোগ তৈরি হতে পারে বলে তিনি জানান।
কাটাবনের ব্যবসায়ী মাহমুদুল হাসান জানান, পাঁচ বছর আগেও এক জোড়া ভায়োলেট রিংনেকের দাম ৬০ থেকে ৮০ হাজার টাকার মধ্যে ছিল, যা সরবরাহ কমে যাওয়ায় বর্তমানে আড়াই লাখ টাকা পর্যন্ত পৌঁছেছে। উল্লেখ্য, রিংনেক প্যারাকিট বছরে সর্বোচ্চ তিনবার প্রজনন করতে পারে এবং প্রতিবার চার থেকে ছয়টি ডিম দেয়, যার বাচ্চা ফোটার হার ৭০ থেকে ৮০ শতাংশ।
অন্যদিকে, বন্য প্রাণী (সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা) আইন, ২০১২ অনুযায়ী দেশীয় আট প্রজাতির টিয়া ধরা, কেনাবেচা বা পোষা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। আইইউসিএন-এর লাল তালিকায় থাকা মেটেমাথা ও ফুলমাথা টিয়া বিপন্ন প্রজাতির অন্তর্ভুক্ত। তবে বন বিভাগের মতে, বিদেশি রিংনেক ভায়োলেটের মতো পাখি পোষার ক্ষেত্রে আইনি কোনো নিষেধাজ্ঞা নেই।




