সামাজিক জীবনের বিভিন্ন অভিজ্ঞতায় আমরা অনেকের সাথে পরিচিত হই। কেউ বন্ধুত্বের হাত বাড়িয়ে দেন, আবার কেউ প্রতারণা বা খারাপ আচরণের মাধ্যমে মনে গভীর ক্ষত তৈরি করেন। লক্ষ্য করলে দেখা যায়, বহু বছর আগের কোনো বন্ধুর মধুর ব্যবহার মন ভুলে গেলেও, কোনো শত্রুর দেওয়া আঘাত বা তার অবয়ব স্মৃতিতে দীর্ঘকাল অমলিন থাকে। অনেকে একে ব্যক্তিগত ক্ষোভ মনে করলেও, এর পেছনে রয়েছে গভীর মনস্তাত্ত্বিক ও স্নায়বিক কারণ।
মনস্তত্ত্ব-বিষয়ক ওয়েবসাইট ‘সাইকোলজি টুডে’-র একটি প্রতিবেদনে স্নায়ুবিজ্ঞানীরা জানিয়েছেন, মস্তিষ্ক প্রাকৃতিকভাবেই বন্ধুত্বের চেয়ে শত্রুতাকে বড় মাইলফলক হিসেবে গণ্য করে এবং তা দীর্ঘসময় সংরক্ষণ করে। হার্ভার্ড স্কুল অব পাবলিক হেলথ-এর সাবেক অধ্যাপক এবং গবেষক উইলিয়াম এ. হ্যাসেলটাইন এই প্রক্রিয়ার ব্যাখ্যা দিয়েছেন। তার মতে, আদিম যুগে গুহায় বসবাসকারী মানুষের জন্য ‘কে বন্ধু’ তার চেয়ে ‘কে বিপজ্জনক বা শত্রু’ তা শনাক্ত করা জীবন রক্ষার জন্য বেশি জরুরি ছিল। এই আদিম আত্মরক্ষার প্রবৃত্তি আজও মানুষের জিনের ভেতর বিদ্যমান। মস্তিষ্ক নেতিবাচক অভিজ্ঞতাকে একটি ‘হুমকি’ হিসেবে চিহ্নিত করে, যাতে ভবিষ্যতে একই ধরনের বিপদ থেকে বাঁচতে পারে। ফলে অবচেতন মন ক্ষতিকর মানুষের স্মৃতিকে স্থায়ীভাবে ধরে রাখে।
স্নায়বিক দিক থেকে দেখলে, যখন কোনো ব্যক্তি শত্রুর মুখোমুখি হন, তখন মস্তিষ্কের আবেগ নিয়ন্ত্রণকারী কেন্দ্র ‘অ্যামিগডালা’ অত্যন্ত সক্রিয় হয়ে ওঠে। এর ফলে শরীরে ‘কর্টিসল’ এবং ‘অ্যাড্রেনালিন’-এর মতো স্ট্রেস হরমোন নিঃসরণ বেড়ে যায়। অধ্যাপক হ্যাসেলটাইন জানান, তীব্র আবেগের এই মুহূর্তে নিঃসৃত হরমোনগুলো স্মৃতি সংরক্ষণ কেন্দ্র ‘হিপোক্যাম্পাস’-এ শক্তিশালী সংকেত পাঠায়। এই রাসায়নিক বিক্রিয়ার কারণে শত্রুর কণ্ঠস্বর, চেহারা বা অপমানের স্মৃতি মস্তিষ্কে স্থায়ীভাবে গেঁথে যায়, যা সাধারণ ভালো লাগার স্মৃতিতে ঘটে না।
এছাড়া মনস্তত্ত্বের ‘নেগেটিভিটি বায়েস’ বা ‘নেতিবাচক পক্ষপাত’ নামক একটি বৈশিষ্ট্য এখানে কাজ করে। এর ফলে মানুষ ইতিবাচক বিষয়ের চেয়ে নেতিবাচক ঘটনাকে বেশি গুরুত্ব দেয়। উদাহরণস্বরূপ, দশটি প্রশংসার চেয়ে একটি তীব্র সমালোচনা বা অপমান মানুষকে অনেক বেশি মানসিক চাপে ফেলে। যেহেতু শত্রুরা আত্মসম্মান ও সামাজিক মর্যাদাকে আঘাত করে, তাই মস্তিষ্ক একে বড় বিপর্যয় মনে করে বারবার মনে করতে থাকে, যা শত্রুর স্মৃতিকে দীর্ঘস্থায়ী করে।
তবে এই স্বয়ংক্রিয় সুরক্ষা ব্যবস্থা বর্তমান আধুনিক জীবনে ক্ষতিকর হতে পারে। দীর্ঘ সময় ধরে শত্রুর প্রতি ঘৃণা বা ক্ষোভ পুষে রাখলে শরীরের স্বয়ংক্রিয় স্নায়ুতন্ত্র উত্তেজিত থাকে। এর ফলে উচ্চ রক্তচাপ, অনিদ্রা, হৃদরোগ এবং দীর্ঘমেয়াদী বিষণ্ণতার মতো স্বাস্থ্যঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে বলে সতর্ক করেছেন উইলিয়াম এ. হ্যাসেলটাইন।




