বাংলাদেশের জলাভূমিতে দেখা মেলে দুটি বিশেষ প্রজাতির পাখির — জলপিপি ও নেউপিপি। পাখি ও বন্য প্রাণী প্রজনন ও চিকিৎসা বিশেষজ্ঞ আ ন ম আমিনুর রহমান সম্প্রতি তার পর্যবেক্ষণে এই দুই পাখির জীবনধারণ ও প্রজনন আচরণ নিয়ে বিস্তারিত তথ্য তুলে ধরেছেন। তিনি গাজীপুর কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিচিকিৎসা বিভাগের শিক্ষক এবং দীর্ঘদিন ধরে পাখি সংরক্ষণ নিয়ে কাজ করছেন।

২০১৮ সালের সেপ্টেম্বর মাসে চুয়াডাঙ্গার বেলগাছি গ্রামের বকচর বিলে বিশেষ এক পাখির সন্ধানে যান রহমান। সেখানে তিনি নেউপিপি নামের এক প্রজাতির পাখি দেখতে পান। বিলটি ছোট হলেও প্রাকৃতিক পরিবেশ ভালো, ফলে বক, ডাহুক, জলমুরগি, মাছরাঙা, সরালি হাঁসসহ নানা জলচর পাখির দেখা মেলে। প্রথম দিন দুটি ছানাসহ পাখিটি দেখতে পেলেও বৃষ্টির কারণে ভালো ছবি তোলা সম্ভব হয়নি। পরদিন সকালে আবার গেলে রৌদ্রোজ্জ্বল পরিবেশে একটি ছানা, পরে আরও দুটি ছানা এবং কিছুক্ষণ পর বয়স্ক পাখিটির দেখা পান। ছানাগুলোর বয়স তখন তিন-চার সপ্তাহ হবে।

পরে চলতি বছরের ২ মে গাজীপুর কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থীদের মাঠকর্মের অংশ হিসেবে রাজধানীর মিরপুরে জাতীয় চিড়িয়াখানায় যান তিনি। সেখানে জলহস্তীশালা পেরিয়ে মায়া হরিণশালার উল্টো পাশের প্রাকৃতিক জলাভূমিতে প্রজননরত অবস্থায় দেখা মেলে জলপিপির। এর আগে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের লেকেও বহুবার ছানাসহ এই পাখি দেখেছেন তিনি।

জলপিপি ও নেউপিপি উভয়ই জ্যাকানিডি (Jacanidae) গোত্রের সদস্য। মাঝারি আকারের এই পাখিদের দীর্ঘ পায়ের আঙুল মাকড়সার জালের মতো ছড়ানো, যা ভাসমান জলজ উদ্ভিদের ওপর সহজে হাঁটতে সাহায্য করে। এ গোত্রের উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য হলো — স্ত্রী পাখিরা ডিম পেড়েই চলে যায়, আর পুরুষেরাই ডিমে তা দেয় ও ছানা লালনপালনের সমস্ত দায়িত্ব বহন করে। চেহারা, আকার, খাদ্যাভ্যাস ও আচরণে খেনি গোত্রের (Rallidae) সঙ্গে মিল থাকলেও এরা বাটান ও গুলিন্দাদের নিকটাত্মীয়।

সারা বিশ্বে জ্যাকানিডি গোত্রের আটটি প্রজাতি থাকলেও বাংলাদেশে পাওয়া যায় মাত্র দুটি। এর মধ্যে জলপিপি বা দলপিপির ইংরেজি নাম ব্রোঞ্জ-উইঙ্গড জ্যাকানা এবং বৈজ্ঞানিক নাম Metopidius indicus। অন্যদিকে নেউপিপি, যা নেউ, পদ্মপিপি, মেওয়া বা জলময়ূর নামেও পরিচিত — এর ইংরেজি নাম ফিজ্যান্ট-টেইল্ড জ্যাকানা এবং বৈজ্ঞানিক নাম Hydrophasianus chirurgus। উভয় প্রজাতিই বাংলাদেশের সচরাচর দৃশ্যমান আবাসিক পাখি এবং দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন দেশেও এদের দেখা মেলে।

খাদ্যাভ্যাসে জলপিপি ভাসমান পাতার ওপর হেঁটে জলজ উদ্ভিদের কচি পাতা, অঙ্কুর, বীজ, পোকামাকড় ও অমেরুদণ্ডী প্রাণী খায়। ডাকের ধরনেও এরা স্বতন্ত্র — জলপিপি বাঁশি বাজানোর মতো ‘সিক-সিক-সিক...’ শব্দ করে, আর নেউপিপি ডাকে ‘নে-উ-ইউ...নে-উ-ইউ...নে-উ-ইউ...’। উভয়ের প্রজননকাল মে থেকে সেপ্টেম্বর। এ সময় স্ত্রীরা এক মৌসুমে একাধিক পুরুষের সঙ্গে মিলিত হয়। শাপলা, পদ্ম বা অন্য ভাসমান উদ্ভিদের পাতার ওপর বাসা বানিয়ে চারটি চকচকে ডিম পাড়ে। জলপিপির ডিম বেগুনি কারুকাজসহ লালচে-বাদামি রঙের, আর নেউপিপির ডিম জলপাই-বাদামি। পুরুষ পাখি একাই ডিমে তা দেয় এবং ২৩ থেকে ২৬ দিনে ডিম ফুটে ছানা বের হয়। ছানারা ইঁচড়ে পাকা — ডিম থেকে বের হওয়ার সঙ্গেই হাঁটতে, সাঁতরাতে ও ডুব দিতে পারে।