দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে যুক্ত থাকা একজন প্রকৃতি ও পরিবেশ বিষয়ক লেখক সম্প্রতি বিশ্ববিদ্যালয়ের জার্মপ্লাজম সেন্টারে গিয়ে সেখানকার ফলবৈচিত্র্যের হালনাগাদ তথ্য সংগ্রহ করেছেন। সেখানেই তাঁর নজরে পড়ে দুটি বিশেষ ফল — তৈকর ও বনকাঁকরোল, যেগুলোর নাম শুনলেও ছবি বা বাস্তবে দেখা যায়নি অনেকেরই।
সেন্টারের কর্মরত বাগানিরা তাঁকে গাছের অবস্থান দেখিয়ে দিলেও ফলগুলো গাছের বেশ উঁচুতে থাকায় ভালোভাবে ছবি তোলা সম্ভব হয়নি। ফলে গাছতলায় পড়ে থাকা নমুনা থেকেই ছবি সংগ্রহ করতে হয়েছে। স্থানীয়ভাবে তৈকর তিকুল বা তিকুর নামেও পরিচিত। এটি একটি মাঝারি আকৃতির পাতাঝরা গাছ, যা সর্বোচ্চ ১৮ মিটার পর্যন্ত উঁচু হতে পারে। গাছের কাণ্ড খাঁজকাটা এবং বাকল গাঢ় ধূসর থেকে গাঢ় বাদামি ও মসৃণ। শাখাগুলো খাটো ও ছড়ানো, পাতা সরল, প্রতিমুখ, ৫ থেকে ১৫ সেন্টিমিটার লম্বা, দীর্ঘায়ত ও পুরু। পরিপক্ব ফলের রং হলুদ, রসালো এবং ওজন ৭০০ থেকে ৭৫০ গ্রাম পর্যন্ত হতে পারে। ভেতরে ৮ থেকে ১০টি বীজ থাকে, স্বাদ টক-মিষ্টি।
তৈকর গাছে বছরে দুবার ফল ধরে — প্রথমবার আগস্ট থেকে সেপ্টেম্বর মাসে ফুল আসে এবং নভেম্বর-ডিসেম্বরের মধ্যে ফল সংগ্রহযোগ্য হয়। দ্বিতীয়বার ফেব্রুয়ারিতে ফুল আসে, এপ্রিল-মে নাগাদ ফল পাকে। একটি পরিণত গাছে ৩০০ থেকে ৩৫০টি ফল হয় এবং হেক্টরপ্রতি ফলন ৭০ থেকে ৭৫ টন পর্যন্ত হতে পারে। বৃহত্তর সিলেটে তৈকর চাষের বিশেষ সম্ভাবনা রয়েছে, সেখানে স্থানীয়ভাবে ফলটি বেশ জনপ্রিয়। কচি ফল তরকারিতে ব্যবহৃত হয়, পাশাপাশি আচার, জ্যাম ও জেলি তৈরি করেও খাওয়া যায়। কচি সবুজ ফল ফালি করে শুকিয়ে সংরক্ষণ করাও যায়।
তৈকর (Garcinia pedunculata) সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ৯১৫ মিটার পর্যন্ত উঁচু চিরহরিৎ অরণ্যে জন্মে। বাংলাদেশে রংপুর ও সিলেট জেলায় প্রাকৃতিকভাবে এটি পাওয়া যায়। আঠা ও রং তৈরিতে এই ফল ব্যবহৃত হয়, আর এর কাঠ তক্তা, কড়িকাঠ ও গৃহ নির্মাণে গুরুত্বপূর্ণ। ভারতের আসাম রাজ্যে এই ফলের চাষ হয় এবং শুষ্ক ফল লেবুর বিকল্প হিসেবে ব্যবহৃত হয়। অপ্রচলিত হলেও তৈকর রপ্তানিযোগ্য ফলের তালিকায় স্থান পেয়েছে। বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট ১৯৯৬ সালে 'বারি তৈকর-১' নামে একটি উন্নত জাত উদ্ভাবন করেছে। ফলটি পুষ্টি ও ঔষধি গুণে সমৃদ্ধ, বিবিধ রোগ নিরাময়ে সহায়ক এবং মুখে রুচি ফেরাতেও সাহায্য করে।
অন্যদিকে বনকাঁকরোল দেখতে সাধারণ কাঁকরোলের মতোই, তবে আকারে দ্বিগুণ বা তিন গুণ বড়। একসময় বনবাদাড় বা গ্রামীণ ঝোপঝাড়ে প্রাকৃতিকভাবে জন্মাত, বর্তমানে প্রাকৃতিক আবাসে এটি দুষ্প্রাপ্য। প্রতিটি বনকাঁকরোলের ওজন প্রায় আধা কেজি, কিছু ক্ষেত্রে আরও বড়ও হতে পারে। সাধারণ কাঁকরোলের সঙ্গে পার্থক্য মূলত ওজন ও পুষ্টিগুণে। এটি দেশি জাতের মধ্যে সবচেয়ে বড়। প্রায় বিলুপ্ত এই কাঁকরোল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল গবেষক চকরিয়ার ফাঁসিয়াখালী বনভূমিতে খুঁজে পেয়েছেন এবং সংরক্ষণে উদ্যোগ নিয়েছেন। বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট এ পর্যন্ত ২২ জাতের কাঁকরোল সংরক্ষণ করেছে, যার মধ্যে তিনটি উন্নত জাত উদ্ভাবনের কাজ প্রায় শেষ। তবে বড় জাতের এই কাঁকরোল তাদের কাছে নেই।
বনকাঁকরোল (Momordica cochinchinensis) একটি লতানো উদ্ভিদ, যা সাধারণত বড় গাছে বেয়ে ওঠে এবং ১৫ মিটার পর্যন্ত লম্বা হতে পারে। আকর্ষী বেশ শক্ত, স্বাদ হালকা তেতো। পাতার বোঁটা মজবুত, ৫ থেকে ১০ সেন্টিমিটার লম্বা। পাতা হৃৎপিণ্ডাকৃতি বা প্রশস্ত ডিম্বাকার, কিনারা ঢেউখেলানো, দাঁতানো এবং আগা সুচালো। ফুলের রং হলুদ থেকে সাদা, পাপড়ি ডিম্বাকার থেকে আয়তাকার। সবজি রান্না ছাড়াও ক্যানডি ও জ্যাম তৈরিতে ব্যবহৃত হয়। বীজের চারপাশের লাল, তৈলাক্ত শাঁস (অ্যারিল) বীজসহ রান্না করা হয়, যা ভারতের কোনো কোনো অঞ্চলে 'জোই গ্যাক' নামে ঐতিহ্যবাহী খাবার। একই পদ্ধতিতে ভিয়েতনামে বিয়ে ও বিভিন্ন উৎসবে এই খাবার পরিবেশন করা হয়।




