ডিম ফুটে বের হওয়ার আগেই সাপের ভ্রূণে একটি আশ্চর্য ঘটনা ঘটে—তাদের শরীর ধীরে ধীরে কুণ্ডলী পাকাতে শুরু করে। তবে কৌতূহলের বিষয় হলো, এই কুণ্ডলী প্রায় সব ক্ষেত্রেই ডান দিকে তৈরি হয়, বাঁ দিকে নয়। দীর্ঘদিন ধরে জীববিজ্ঞানীদের মনে এই প্রশ্ন ছিল যে কেন সাপের ভ্রূণ বাঁ দিকের পরিবর্তে ডান দিকেই কুণ্ডলী পাকায়। সম্প্রতি এই রহস্যের সমাধান দিয়েছেন একদল আন্তর্জাতিক গবেষক। তাঁদের মতে, এর পেছনে দায়ী সাপের শরীরের একটি বিশেষ অঙ্গ, যা ভ্রূণ অবস্থায় সম্পূর্ণভাবে শরীরের ভেতরে প্রবেশ করে না—সেটি হলো অন্ত্র বা ইনটেস্টাইন।
কানাডার ইউনিভার্সিটি অব ব্রিটিশ কলাম্বিয়ার প্রাণিবিজ্ঞানী আলেক্সান্দ্রা ওয়েবারের নেতৃত্বে বিভিন্ন দেশের বিজ্ঞানীরা সাপের ভ্রূণের এই অস্বাভাবিক আচরণ নিয়ে গবেষণা চালিয়েছেন। তাঁদের গবেষণাপত্রটি প্রকাশিত হয়েছে বিজ্ঞানভিত্তিক জার্নাল কারেন্ট বায়োলজিতে। গবেষণার অংশ হিসেবে ৩৯ প্রজাতির সাপ এবং অন্যান্য পা-বিহীন সরীসৃপের ৯০০টিরও বেশি ভ্রূণের ছবি পরীক্ষা করেছেন তাঁরা। পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, ভ্রূণ অবস্থায় সাপের শরীর ডান দিকে কুণ্ডলী পাকানো শুরু করে—এবং এটি ঘটে পেশি তৈরি হওয়ারও আগে। অর্থাৎ, সাপের ভ্রূণ নিজের শরীর নড়িয়ে এই কুণ্ডলী তৈরি করে না, বরং এটি একটি স্বতঃস্ফূর্ত প্রক্রিয়া।
এই গবেষণার সূত্রপাত ২০২০ সালে, করোনা মহামারির সময়। তখন কানাডার অটোয়ায় অবস্থান করছিলেন কানাডিয়ান মিউজিয়াম অব নেচারের বিবর্তনীয় জীববিজ্ঞানী তেতসুতো মিয়াশিতা, যিনি এই গবেষণাপত্রের সহ-লেখক। তিনি শিক্ষার্থীদের জন্য দূর থেকে পরিচালনা করা যায় এমন একটি গবেষণা প্রকল্প খুঁজছিলেন। সেই সময় তাঁর পিএইচডি সুপারভাইজারের কথা মনে পড়ে, যিনি প্রাণীদের শরীরে ডান-বাঁ পার্থক্য কীভাবে গড়ে ওঠে তা নিয়ে গভীর আগ্রহী ছিলেন। সাপের ভ্রূণের ছবি দেখতে গিয়ে মিয়াশিতার মনেও প্রশ্ন জাগে—সাপের ভ্রূণ কি সব সময় একই দিকে কুণ্ডলী পাকায়? বিভিন্ন জাদুঘরের সঙ্গে যোগাযোগ করে মিয়াশিতা ও তাঁর শিক্ষার্থীরা সাপসহ অন্যান্য পা-বিহীন সরীসৃপের ৯০০টির বেশি ভ্রূণের ছবি সংগ্রহ করেন। ছবিগুলো একে একে পরীক্ষা করে তাঁরা লক্ষ্য করেন, বিকাশের একেবারে শুরুর দিকেই সাপের ভ্রূণ ডান দিকে কুণ্ডলী পাকাতে শুরু করে, যদিও তখনো পেশি তৈরি হয়নি। ফলে প্রশ্ন আরও জোরালো হয়—পেশি না থাকলে কীভাবে ভ্রূণের শরীর ডান দিকে ঘুরছে?
এর উত্তর খুঁজতে বিজ্ঞানীরা সাপের ভ্রূণের সিটি স্ক্যান করেন। স্ক্যানের মাধ্যমে তাঁরা একটি অভূতপূর্ব শারীরিক গঠন দেখতে পান, যা আগে কখনো এভাবে শনাক্ত করা যায়নি। দেখা যায়, ভ্রূণের শরীরের বাইরে তখন একটি অন্ত্র থাকে, যা কুসুম থেকে আসা রক্তনালির জাল দিয়ে ঘেরা। মিয়াশিতা এই গঠনটির নাম দিয়েছেন ‘অন্ত্রের স্তম্ভ’। ধীরে ধীরে এটি কুসুম থেকে আলাদা হতে থাকে এবং একই সঙ্গে সাপের দীর্ঘায়িত শরীরকে ধরে রাখে।
বিষয়টি বোঝার জন্য সাপের ভ্রূণের সঙ্গে কুসুমের সম্পর্ক বোঝা জরুরি। ভ্রূণের বিকাশের সময় কুসুম সব সময় এর বাঁ পাশে অবস্থান করে। অন্যদিকে, সাপের শরীর লম্বা হতে হতে কুসুমের বিপরীত দিকে বাঁকতে থাকে। শরীরকে আটকে রাখা অন্ত্রের গঠন এবং কুসুমের অবস্থানের কারণে ভ্রূণে এক ধরনের টান তৈরি হয়, যার ফলেই শরীর কুণ্ডলী পাকাতে পাকাতে ডান দিকে মোড় নেয়। মিয়াশিতা এটিকে একটি ফিতার সঙ্গে তুলনা করেছেন—যদি একটি ফিতার দৈর্ঘ্য বাড়তে থাকে কিন্তু তার একটি অংশ আটকে থাকে, তাহলে বাড়তে থাকা অংশটি বাঁক নিয়ে কুণ্ডলী পাকাতে পারে। সাপের ভ্রূণের ক্ষেত্রেও ঠিক একই ঘটনা ঘটে।
তবে সাপের ভ্রূণের কাহিনী এখানেই শেষ নয়। ভ্রূণ বড় হওয়ার সময় যখন পেশি তৈরি হয় এবং নড়াচড়ার ক্ষমতা অর্জিত হয়, তখন পরিস্থিতি বদলে যায়। বিকাশের শেষ পর্যায়ে কুণ্ডলী পাকানো ভ্রূণগুলোর প্রায় অর্ধেক আবার বাঁ দিকে কুণ্ডলী পাকাতে শুরু করে। এর অর্থ, বিকাশের শুরুর দিকে যে ডানমুখী কুণ্ডলী তৈরি হয়েছিল, পেশি সচল হওয়ার পর নিজের নড়াচড়ার কারণেই তা পরিবর্তিত হতে পারে। গবেষকদের মতে, এই আবিষ্কার শুধু সাপের বিকাশ প্রক্রিয়া নয়, বরং সাধারণভাবে মেরুদণ্ডী প্রাণীদের শরীরের গঠনগত অসামঞ্জস্য বোঝার ক্ষেত্রেও নতুন দিগন্ত খুলে দিতে পারে।




