গত পাঁচ বছরে বাংলাদেশে বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগের মধ্যে সবচেয়ে বেশি প্রাণহানির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে বজ্রপাত। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের একটি সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে জানা গেছে, ২০২১ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত বজ্রপাত, বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, অগ্নিকাণ্ড, ভূমিকম্প ও পাহাড়ধস—এই ছয়টি প্রধান দুর্যোগে মোট ২ হাজার ৫৩৩ জনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে মাত্র বজ্রপাতেই প্রাণ হারিয়েছেন ১ হাজার ৫৩০ জন, যা মোট মৃত্যুর ৫৯.৫ শতাংশ। এই আশঙ্কাজনক পরিসংখ্যানের কারণে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার অগ্রাধিকার তালিকায় বজ্রপাতকে এক নম্বরে রাখা হয়েছে। গত ৬ অক্টোবর এক সংসদীয় কমিটির বৈঠকে এই প্রতিবেদনটি পেশ করা হয়।

প্রতিবেদনে দেখা গেছে, প্রাণহানির তালিকার দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে অগ্নিকাণ্ড, যাতে ৬৫৪ জন নিহত হয়েছেন এবং মোট ঘটনার সংখ্যা ১ লাখ ২৪ হাজার ৪৮৬টি। অন্যদিকে, নয়টি বড় বন্যার প্রভাবে ১৯৭ জন, পাহাড়ধসে ৯০ জন, ছয়টি ঘূর্ণিঝড়ে ৫২ জন এবং ভূমিকম্পে ১০ জনের মৃত্যু হয়েছে। তবে প্রাণহানির বিপরীতে আর্থিক ক্ষতির হিসাবে চিত্রটি ভিন্ন। সরকারি হিসাব অনুযায়ী, এই পাঁচ বছরে সামগ্রিক ক্ষতি ৪৩ হাজার ৮২৯ কোটি টাকা। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ২৯ হাজার ৮৬০ কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে বন্যার কারণে। ঘূর্ণিঝড়ে ক্ষতি হয়েছে ১১ হাজার ৭৩৬ কোটি টাকা, অগ্নিকাণ্ডে ২ হাজার ২০ কোটি টাকা, ভূমিকম্পে ১০৮ কোটি টাকা এবং বজ্রপাতে ১০৫ কোটি টাকার আর্থিক ক্ষতি হয়েছে।

বজ্রপাতের মাসভিত্তিক প্রবণতা বিশ্লেষণে দেখা যায়, জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারিতে এর প্রকোপ কম থাকলেও মার্চ থেকে বাড়তে শুরু করে এবং মে মাসে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছায়। এরপর জুন-জুলাইতে তা কমলেও সেপ্টেম্বরে আবার কিছুটা বৃদ্ধি পায়। ভৌগোলিক অবস্থানের দিক থেকে দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চল, বিশেষ করে সিলেট এবং উত্তরাঞ্চলে বজ্রপাতের হার সবচেয়ে বেশি। নিহতদের একটি বড় অংশই প্রান্তিক কৃষক।

বজ্রপাতকে ২০১৬ সালে সরকারিভাবে 'দুর্যোগ' হিসেবে ঘোষণা করা হলেও এর ঝুঁকি কমাতে পর্যাপ্ত প্রস্তুতি নেই বলে মনে করেন দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিশেষজ্ঞ গওহার নঈম ওয়ারা। তিনি জানান, বজ্রপাতে মূলত দরিদ্র মানুষ ও কৃষকরাই সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হন। শুধু মানুষ নয়, গবাদি পশুর মৃত্যুহার মানুষের তুলনায় তিন-চার গুণ বেশি, যা হিসাবে আনা প্রয়োজন। তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, আহতদের জন্য একটি নির্দিষ্ট চিকিৎসা প্রটোকল তৈরি করা জরুরি। বিশেষজ্ঞের মতে, বিজিবি বা পল্লী বিদ্যুৎ কার্যালয়ের মতো কৃষকদের মাঠ ও বাড়িতেও সুরক্ষা ব্যবস্থা নিশ্চিত করা এবং গাছ কাটা বন্ধ করার মাধ্যমে এই প্রাণহানি কমানো সম্ভব। প্রতিবেদনে স্থানীয় পর্যায়ে সতর্কবার্তা প্রদান, জনসচেতনতা বৃদ্ধি এবং নিরাপদ আশ্রয়ের ব্যবস্থা জোরদার করার সুপারিশ করা হয়েছে।