ফ্রিজার থেকে বের করা একটি স্বচ্ছ পানির বোতলে সামান্য টোকা দিলেই তা মুহূর্তের মধ্যে বরফে পরিণত হতে দেখা যায়। পানির ভেতরে থাকা কণা বা বোতলের পৃষ্ঠ আগে থেকেই বিদ্যমান থাকলেও, একটি সামান্য ধাক্কা কীভাবে এমন আমূল পরিবর্তন আনে, তা নিয়ে এক শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে গবেষণা করছেন বিজ্ঞানীরা।
এই প্রক্রিয়ার ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, ১৯০৬ সালে বিজ্ঞানী বার্নস প্রমাণ করেন যে, প্রবল আলোড়নের ফলে পাতিত পানি অপেক্ষাকৃত উচ্চ তাপমাত্রাতেই জমে যেতে পারে। তাঁর পরীক্ষায় পানির তাপমাত্রা ছিল মাইনাস ৩ থেকে মাইনাস ৪ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে। পরবর্তীতে ১৯১৩ সালে ইয়ং এবং ভ্যান সিকলেন পানির ট্যাংকে থাকা একটি নেহাইয়ের ওপর হাতুড়ি ফেলে অতিশীতল পানিকে জমিয়ে দেখান। আবার ১৯৪৮ সালে ডরসি লক্ষ্য করেন, অতিশীতল পানি নলের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে ঢাললেই তা জমে যায় না, তবে প্রবল ঝাঁকুনি দিলে বরফ হওয়ার আগে পানি প্রায় ২ ডিগ্রি পর্যন্ত উষ্ণ হতে পারে।
বিজ্ঞানীদের মতে, পানি ঝাঁকালে বা ধাক্কা দিলে জমে যাওয়ার পেছনে চাপের পরিবর্তন একটি বড় কারণ। আকস্মিক ধাক্কায় পানির ভেতরে খুব অল্প সময়ের জন্য চাপের তারতম্য ঘটে। বিশেষ কিছু পরিস্থিতিতে পানির প্রসারণের ফলে স্থানীয়ভাবে 'ঋণাত্মক চাপ' তৈরি হতে পারে, যা বরফ তৈরির প্রক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করে। ক্লডিয়া মারকোলির একটি মডেল অনুযায়ী, মাইনাস ১১ ডিগ্রি সেলসিয়াসের নিচে নির্দিষ্ট কিছু পরিস্থিতিতে বরফ তৈরির প্রক্রিয়াটি আরও শক্তিশালী হয়ে ওঠে। এই প্রক্রিয়ায় প্রায় ১৮৯ মেগাপ্যাসকেল ঋণাত্মক চাপের প্রয়োজন হয়, যা সাধারণ বায়ুমণ্ডলীয় চাপের তুলনায় প্রায় ১ হাজার ৯০০ গুণ বেশি। বোতলে টোকা দেওয়ার ফলে এই ধরনের চাপ খুব সাময়িক ও স্থানীয়ভাবে তৈরি হতে পারে।
তবে কেবল চাপের পরিবর্তন দিয়েই সব ঘটনা ব্যাখ্যা করা সম্ভব নয়। ধাক্কা বা আলোড়ন অন্য উপায়েও বরফ তৈরির সূচনা করতে পারে। যেমন—পাত্রের দেওয়ালে থাকা অতি ক্ষুদ্র আঁচড়, পানির ভেতরে ভাসমান কোনো কণা অথবা আগে থেকেই বিদ্যমান ক্ষুদ্র বরফ স্ফটিক এক্ষেত্রে অনুঘটক হিসেবে কাজ করে। একবার যখন একটি স্থিতিশীল বরফ স্ফটিক তৈরি হয়, তখন তার চারপাশের পানির অণুগুলো দ্রুত যুক্ত হতে থাকে এবং পুরো বোতলের পানি দ্রুত বরফে পরিণত হয়।




