ইসলামের ইতিহাসে এমন কিছু মনীষী আছেন, যাঁদের চিন্তা ও কর্ম শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে মুসলিম উম্মাহর বিশ্বাস ও ধর্মচর্চাকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছে। ইমাম আবু হানিফা (রহ.) তাঁদের মধ্যে অন্যতম। ফিকহশাস্ত্রকে সুসংগঠিত রূপ দেওয়া এবং ইজতিহাদের ধারা প্রতিষ্ঠায় তাঁর অবদান চিরস্মরণীয়। তাঁর জীবন ছিল জ্ঞানসাধনা, নৈতিক দৃঢ়তা এবং সত্যের প্রতি আপসহীন অবস্থানের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।
তাঁর মূল নাম ছিল নু’মান ইবনে সাবিত। বংশপরিচয় নিয়ে ঐতিহাসিকদের মধ্যে কিছু মতভেদ থাকলেও বেশিরভাগ নির্ভরযোগ্য সূত্র মতে, তাঁর পূর্বপুরুষ ‘যুত্বা’ ছিলেন বানু তাইমুল্লাহ ইবনে সা’লাবা গোত্রের মুক্ত দাস। তবে তাঁর নাতি ইসমাইলের বর্ণনা অনুযায়ী তাঁদের পরিবারের কেউ কখনো দাসত্বে আবদ্ধ ছিলেন না। দুই বর্ণনার সমন্বয়ে ধারণা করা যায়, পূর্বপুরুষ সূত্রে দাসত্বের সম্পর্ক থাকলেও তাঁর পিতা সাবিত ও তিনি নিজে পূর্ণ স্বাধীন ও সম্মানজনক পরিবারের সন্তান ছিলেন।
‘আবু হানিফা’ তাঁর প্রকৃত নাম ছিল না। এই উপনামের উৎপত্তি নিয়েও রয়েছে চমৎকার ঐতিহাসিক বিশ্লেষণ। কুফার আঞ্চলিক ভাষায় লিখনের দোয়াতকে ‘হানিফা’ বলা হতো। লেখালেখির প্রতি প্রবল অনুরাগের কারণে তিনি সর্বদা সঙ্গে দোয়াত-কলম রাখতেন, তাই মানুষ তাঁকে ‘আবু হানিফা’ অর্থাৎ দোয়াতের মালিক নামে ডাকত। আবার অন্য মতে, ইসলামি অনুশাসনের প্রতি একনিষ্ঠ সমর্পণের কারণে তিনি এই অভিধা লাভ করেন।
৮০ হিজরিতে ইরাকের সমৃদ্ধ কুফা নগরীতে তাঁর জন্ম হয়। তাঁর পূর্বপুরুষের আদি নিবাস হিসেবে আফগানিস্তানের কাবুলের নাম সর্বাধিক প্রসিদ্ধ। ব্যক্তিগত জীবনে তিনি ছিলেন অত্যন্ত আকর্ষণীয় ও সুরুচিপূর্ণ। মধ্যম গড়নের সুগঠিত চেহারার এই মহামানব পরিচ্ছন্নতা ও সৌন্দর্যবোধে ছিলেন অতুলনীয়। তাঁর আভিজাত্যপূর্ণ পোশাক ও সুবাসিত জীবনের সুখ্যাতি ছিল। তিনি এত সুগন্ধি ব্যবহার করতেন যে, তিনি কোনো গলি দিয়ে হেঁটে গেলে মানুষ সুবাস পেয়েই বুঝতে পারত যে এ পথ দিয়ে আবু হানিফা গেছেন। প্রয়োজনের বাইরে তিনি কথা বলতেন না; তবে কোনো বিষয়ে কথা বললে প্রজ্ঞা ও গভীর চিন্তার দ্যুতি প্রকাশ পেত।
তাঁর জীবনের সর্বশ্রেষ্ঠ ঐতিহাসিক মর্যাদা হলো তিনি ছিলেন একজন প্রবীণ ‘তাবেয়ি’। মাত্র ১৬ বছর বয়সে পিতার সঙ্গে হজ পালনকালে তিনি প্রখ্যাত সাহাবি আবদুল্লাহ ইবনে হারেস ইবনে জুজ’ (রা.)-এর সাক্ষাৎ পান এবং তাঁর কাছ থেকে হাদিস শ্রবণ করেন। এছাড়া আনাস ইবনে মালিকসহ একাধিক সাহাবির সান্নিধ্য লাভের সৌভাগ্যও তাঁর হয়েছিল।
ইমাম আবু হানিফার শিক্ষাজীবন ছিল ব্যাপক ও বৈচিত্র্যময়। তিনি প্রায় চার হাজার প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ উস্তাদের কাছে জ্ঞানার্জন করেছেন। প্রারম্ভিক জীবনে তিনি ছিলেন অত্যন্ত সফল কাপড়ের ব্যবসায়ী। সময়ের মহান ফকিহ ইমাম শাবির তীক্ষ্ণ পর্যবেক্ষণে তাঁর অসামান্য বুদ্ধিমত্তা ধরা পড়ে এবং তাঁরই পরামর্শে তিনি জ্ঞানচর্চায় পুরোদমে আত্মনিয়োগ করেন। প্রথমে দর্শনশাস্ত্র ও বিভিন্ন ভ্রান্ত মতবাদের খণ্ডনে দক্ষতা অর্জন করলেও দ্রুতই তিনি উপলব্ধি করেন যে সাহাবি ও তাবেয়িদের মূল পথ ছিল বিশুদ্ধ ফিকহ ও সামাজিক সেবা।
ফিকহশাস্ত্রে তাঁর স্থায়ী হওয়ার পেছনে একটি তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা আছে। এক নারী তাঁকে তালাক সংক্রান্ত একটি জটিল বিধান জিজ্ঞেস করলে তিনি তৎক্ষণাৎ উত্তর দিতে না পেরে প্রশ্নকর্তাকে ফকিহ হাম্মাদ ইবনে সোলাইমানের দরবারে পাঠান। পরে সেই মাসআলার উত্তর শুনে তিনি বুঝতে পারেন বাস্তব জীবনে ফিকহচর্চার প্রয়োজনীয়তা কত গভীর। এরপর টানা ১০ বছর হাম্মাদের দরসে বসে নিজেকে ফিকহের অনন্য পণ্ডিত হিসেবে গড়ে তোলেন।
ইসলামি অন্যান্য বিদ্যায় (তাফসির, হাদিস, সাহিত্য) অগাধ পাণ্ডিত্য থাকা সত্ত্বেও তিনি ফিকহকেই জীবনের মূল সাধনা হিসেবে গ্রহণ করেন। এর কারণ হিসেবে তিনি বলতেন—এটি মানুষের পার্থিব জীবন ও পরকালের নাজাত নিশ্চিত করার জন্য সরাসরি কার্যকর শাস্ত্র। উস্তাদ হাম্মাদের ইন্তেকালের পর সর্বসম্মত সিদ্ধান্তে তিনি কুফার প্রধান জ্ঞানপীঠের প্রধান হিসেবে স্থলাভিষিক্ত হন। তাঁর দরস পুরো মুসলিম বিশ্বের অন্যতম প্রধান গবেষণা কেন্দ্রে পরিণত হয়।
তাঁর সবচেয়ে বড় কৃতিত্ব হলো, তিনিই প্রথম প্রাজ্ঞ আলেম যিনি ফিকহশাস্ত্রকে সুনির্দিষ্ট অধ্যায়, অনুচ্ছেদ (যেমন: তাহারাত, সালাত, বুয়ু/ব্যবসা-বাণিজ্য) ও বিষয়াভিভাগে বিন্যস্ত করেন। তিনি ‘ফিকহি শুরা’ বা যৌথ গবেষণা পরিষদ গঠন করে সমকালীন ও ভবিষ্যৎ সম্ভাব্য আইনি জটিলতার যৌক্তিক সমাধান তৈরি করেছিলেন। তাঁর দরস থেকেই তৈরি হয়েছিলেন ইমাম আবু ইউসুফ, ইমাম মুহাম্মদ ইবনুল হাসান আশ-শায়বানি, ইমাম জুফার, হাসান ইবনে জিয়াদ এবং আবদুল্লাহ ইবনে মোবারকের মতো বিশ্ববরেণ্য পণ্ডিতেরা। তাঁরাই তাঁর ফিকহি ধারা ও গবেষণা পদ্ধতি সমগ্র বিশ্বে ছড়িয়ে দেন। এর ফলেই কালক্রমে ‘হানাফি ফিকহ’ মুসলিম বিশ্বের সর্বাধিক প্রসারিত আইনি ব্যবস্থায় পরিণত হয়।
সমকালীন মনীষীদের মূল্যায়নেও তিনি ছিলেন অনন্য। ইমাম মালেক (রহ.) বলেন, ‘তিনি এমন এক দূরদর্শী পুরুষ ছিলেন, যিনি যদি এই কাঠের স্তম্ভটিকে সোনা বলে দাবি করতেন, তবে যুক্তির প্রামাণ্যতায় তা প্রমাণ করে ছাড়তেন!’ ইমাম শাফেয়ি (রহ.) বলেন, ‘ফিকহশাস্ত্রে গভীরতা অর্জন করতে চাইলে সমগ্র মানবজাতিকে আবু হানিফার মুখাপেক্ষী হতে হবে।’ অন্যদিকে ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল (রহ.) তাঁকে মেধা ও তাকওয়ার ক্ষেত্রে যুগের শ্রেষ্ঠ ইমাম হিসেবে স্মরণ করেছেন।
নিজে বেশ ধনী ব্যবসায়ী হওয়ায় তিনি অভাবী আলেম ও শিক্ষার্থীদের নিয়মিত বৃত্তি দিতেন, কিন্তু শাসক কিংবা কারো ব্যক্তিগত উপঢৌকন বা সরকারি সুবিধা কখনো গ্রহণ করতেন না। আব্বাসীয় খলিফা আবু জাফর মনসুর তাঁকে রাষ্ট্রের প্রধান বিচারপতির পদ গ্রহণের চাপ দেন। কিন্তু নিরপেক্ষতা অক্ষুণ্ন রাখা এবং বিচার বিভাগকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত রাখার অঙ্গীকার থেকে তিনি তা প্রত্যাখ্যান করেন। ফলশ্রুতিতে তাঁকে কারাগারে নিক্ষেপ করা হয় এবং প্রতিদিন চাবুকপেটা করা হয়। নির্যাতন সহ্য করেও তিনি নীতির প্রশ্নে বিন্দুমাত্র আপস করেননি। বহু ঐতিহাসিক বর্ণনানুসারে, অবশেষে বন্দী অবস্থাতেই তাঁকে বিষপ্রয়োগ করা হয়। ১৫০ হিজরিতে জ্ঞানচর্চার এই মহান সাধক সেজদারত অবস্থায় শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন। তাঁর মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়লে বাগদাদে শোকের ছায়া নেমে আসে। জানাজায় বিপুল মানুষের ঢল নামে এবং পরপর ছয়বার জানাজার নামাজ আদায় করতে হয়েছিল।




